বৃহস্পতিবার, জুলাই ৯, ২০২০
Home District সুন্দরবনের বাসিন্দাদের কেন ভিনরাজ্যে কাজ করতে যেতে হবে?

সুন্দরবনের বাসিন্দাদের কেন ভিনরাজ্যে কাজ করতে যেতে হবে?

১৭৩ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

মূল্যটা বহু আগেই বুঝেছে ইউনেস্কো। তাই দিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা। আমরা বোধহয় সেই মূল্যটা আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ স্থান সুন্দরবন। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত প্রকৃতির এই সৃষ্টি দেখে অবাক হতে হয়। কত গাছ, কত নদী, কত পাখি, কত প্রাণী। কিন্তু তার মধ্যেই রয়েছে আর একটি কঠিন বাস্তবের ছবি। দারিদ্র। সুন্দরবন দেশের দরিদ্র এলাকাগুলির মধ্যে অন্যতম। করোনার জেরে জারি হওয়া লকডাউনের মধ্যে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের ছবিটা সামনে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এরকম অনেকে কাজ করছেন। এবং তাদের একটা বড় অংশের মানুষ সুন্দরবনের।

এখন প্রশ্ন হল, যে এলাকা এত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, সেই এলাকার মানুষকে কেন টাকা রোজগারের জন্য বাড়ি ছেড়ে ভিনরাজ্যে ছুটতে হবে? সুন্দরবনের অর্থনীতির প্রধান ভিত হল কৃষি। তবে বিগত কয়েক দশকে সুন্দরবনে কৃষিকাজ থেকে যথেষ্ট রোজগার হচ্ছে না। কৃষি সরঞ্জামের মূল্য একদিকে যেমন বেড়েছে, সেই তুলনায় বাড়েনি কৃষকদের ফসলের মূল্য। নদী ঘেরা সুন্দরবনের নদীবাঁধের সমস্যাও কৃষিক্ষেত্রে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আয়লা, ফণী, বুলবুল, আম্ফানের বহু আগে থেকেই সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকার নদী বাঁধগুলির অবস্থা শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। কার দোষ, কোন সরকারের আমলে কি কাজ হয়নি, এ নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলতে থাকে। কিন্তু তার মধ্যে আড়ালে চলে যায় প্রকৃত সমস্যা।

যেমন উদাহরণ হিসেবে পাথরপ্রতিমার রাক্ষসখালী নদী বাঁধের কথা বলা যেতে পারে। তখনও কাকদ্বীপের সঙ্গে পাথরপ্রতিমার সড়কপথে যোগাযোগ তৈরি হয়নি। গ্রামের প্রধান সড়ক হিসেবে পরিচিত ছিল ভগবৎপুর কুমীর প্রকল্প থেকে পাথরপ্রতিমা বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত ইঁটের রাস্তা। ছোটোবেলায় দেখতাম, প্রায় প্রত্যেক বছর বর্ষায় নদীবাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় গ্রামবাসীরা ছোটাছুটি করতেন। বেশ কয়েকবার নদীবাঁধ ভেঙে ধানখেতে নোনা জল ঢুকেও ছিল। তারপর কাকদ্বীপের সঙ্গে পাথরপ্রতিমার সড়ক যোগাযোগ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার সেই রাস্তার জেরে গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীবাঁধ ভেঙে জলে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছেন। বিশেষত যারা নদীবাঁধের বিপরীত দিকে থাকেন, তাদের বাড়িঘর রাক্ষসখালীর জলে প্লাবিত হওয়ার সেরকম আশঙ্কা নেই। কিন্তু রাক্ষসখালী নদীবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় যারা বাস করেন, তাদের এখনও সেই আশঙ্কা মাথায় নিয়ে জীবন কাটাতে হয়।

নদীবাঁধ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান যতদিন না তৈরি হচ্ছে, ততদিন সুন্দরবনের কৃষিক্ষেত্রে এইভাবে বারে বারে আঘাত নেমে আসবে। ফলে সুন্দরবন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। জমিজমা থাকা সত্ত্বেও সংসার চালানোর জন্য পরিযায়ী শ্রমিকের তকমা নিয়ে ভিন রাজ্যে ছুটতে হবে।

পরিকাঠামোগত অনুন্নতির জেরে সুন্দরবনে পর্যটনের বিকাশ ঘটেনি। পর্যটন এখনও একটা অসংগঠিত ক্ষেত্রের মতো সুন্দরবনে কাজ করে। সারা বছর সুন্দরবনে পর্যটকের আগামন না থাকলেও পরিকাঠামোগত, বিশেষত যোগাযোগের উন্নতি ঘটলে আরও বেশি মাত্রায় দেশি এবং বিদেশি পর্যটকরা সুন্দরবনে পা রাখতে পারেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি মজবুত হওয়ার পাশাপাশি অনেক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সর্বোপরি স্থানীয় স্তরের রাজনৈতিক নেতাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে সুন্দরবন এলাকায় শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। এখনও দলের উপরমহলের শেখানো বুলি আউড়েচলেন সুন্দরবনের অধিকাংশ নেতারা। তাদের আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষত নিজের এলাকার সমস্যার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে নজর দিতে হবে।

ছবি দ্য অয়্যার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

লকডাউনে দেশবিদেশের শিল্পীদের সঙ্গে আড্ডায় দীপায়ন ঘোষ

২০২০ সালের প্রথম থেকে একের পর এক দুর্যোগ, মহামারি, অর্থনৈতিক সঙ্কট ও বর্তমানে আন্তর্জাতিক সীমানায় উত্তাপ, সব মিলে চলছে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার...

পাখিরালায় অস্বাভাবিক মৃত্যু

প্রদ্যুৎ বাছাড় অস্বাভাবিক মৃত্যু হল এক ব্যক্তির। রবিবার রাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবার পাখিরালা গ্রামের ঘটনা। স্থানীয় সূত্রে খবর,...

কলকাতায় মদের হোম ডেলিভারি শুরু করল জোম্যাটো

বিশ্বজিৎ মান্না বর্তমান প্রজন্মের অনেকে প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেননি। যে কয়েকজন প্রবীণ সেই সময়ের চিত্র নিজের চোখে দেখেছেন,...

সৌম্যর সুইসাইড নোট: হোঁশিয়ার রেহনা নগর মে চোর আওয়েগা

বিশ্বজিৎ মান্না গড়িয়ায় থার্টিন্থ ফ্লোরের বারান্দাটা কি এখন আমায় চিনতে পারবে! অনেক দিন দেখিনি। যেমন দেখিনি টালিগঞ্জে আমার প্রিয়...

Recent Comments

error: Content is protected !!