বৃহস্পতিবার, জুন ১৭, ২০২১
Home feature কেন মানুষ খেতে ভালোবাসে সুন্দরবনের বাঘ ?

কেন মানুষ খেতে ভালোবাসে সুন্দরবনের বাঘ ?

৪২৫ Views

সুন্দরবনের মানুষখেকো বাঘ নিয়ে নানা কাহিনী রয়েছে। সুন্দরবনে আস্ত একটি গ্রাম আছে, যে গ্রামের নাম হল বিধবাদের গ্রাম। কারণ ওই গ্রামের অধিকাংশ পুরুষেরই মৃত্যু হয়েছে বাঘের থাবায়। মধু সংগ্রহ বা মাছ ধরতে গিয়ে রয়্যাল বেঙ্গলের হাতে তাদের বেঘোরে প্রাণ গিয়েছে। তবে ঘটনা হল, সুন্দরবনের বাঘের চরিত্র বরাবর এমনই।

১৬৬৬ সালে ফ্রেঞ্চ এক্সপ্লোরার ফ্রাঙ্কোই বার্নিয়ার সুন্দরবন সম্পর্কে লিখেছেন, এই দ্বীপগুলির মধ্যে অধিকাংশতেই পা রাখা বেশ বিপজ্জনক। কারণ প্রায়শই দেখা যায় বাঘের আক্রমণের মুখে পড়ছে মানুষ। সুন্দরবনের বাঘ নৌকাতেও ঝাঁপিয়ে পড়ে আক্রমণ চালিয়েছে। ঘুমন্ত মানুষকে তুলে নিয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সুন্দরবনের বাঘ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এবং বৃহৎ প্রাণী।

প্রসঙ্গত, পৃথিবীর অন্যত্র বাঘ সাধারাণত মানুষকে প্রাণে মারে না। কিন্তু সুন্দরবনে এমন ঘটনা বিরল। এখানে বাঘের থাবায় একবার কেউ পড়লে, তার বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কম। শুধু মানুষ মেরেই সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল ক্ষান্ত থাকে না, তাদের কাছে মানুষের মাংস বেশ প্রিয়। অথচ বিশ্বের অন্যত্র বাঘেদের খাদ্য তালিকায় মানুষের নাম নেই বললেই চলে।

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঘ (সাইবেরিয়ান টাইগার সবচেয়ে বড়)। এক বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ বলেন, সুন্দরবনের বাঘেদের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার বাঘেদের আচরণের একটা পার্থক্য আছে। সুন্দরবনে প্রবেশ করলেই যেন মৃত্যুর একটা গন্ধ পাওয়া যায়। প্রতি মুহূর্তে আপনার মনে হতে পারে, মৃত্যু আপনার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো সময় আক্রমণ হতে পারে।

জার্মান বায়োলজিস্ট হুবার্ট হেনড্রিক্স মনে করেন, সুন্দরবনের বাঘেদের এই আচরণের জন্য মূলত দায়ী সেখানকার নোনা জল। ১৯৭১ সালে এই বিষয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় তিন মাসের জন্য গবেষণা চালিয়েছিলেন হুবার্ট। যেসমস্ত জায়গায়ে বাঘের আক্রমণ বেশি ঘটে, সেখানকার জলে লবণের পরিমাণ যাচাই করেন তিনি। এই জার্মান গবেষকের ডেটা বলছে, সেই সমস্ত এলাকাতেই বাঘের আক্রমণ বেশি ঘটে যেখানকার নদী-নালার জলে লবণের পরিমাণ বেশি।

সুন্দরবনে সাধারণত পুকুর ছাড়া কোথাও মিষ্টি জল নেই। বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের জল সুন্দরবনের প্রায় সমস্ত নদীতে প্রবেশ করে। কোনো কোনো স্থানে জলে লবণের পরিমাণ ১.৫ শতাংশ। সুন্দরবনের নদীর জলে লবণের পরিমাণ এতটাই অতিরিক্ত যে এই জল পান করলে লিভার এবং কিডনির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। জার্মান গবেষক হেনড্রিক্স বলেন, এই জল পান করার ফলেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারদের মধ্যে ক্ষিপ্রতা কিছুটা হলেও বেশি। তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে গিয়েছে এই লবণাক্ত জলের কারণে। তার গবেষণার মাঝপথেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বাধে। গবেষণার কাজ অসমাপ্ত রেখে হেনড্রিক্সকে দেশে ফিরতে হয়। নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় তিনি আর বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। ফলে গবেষণার তথ্য যাচাই করার সুযোগ পাননি এই জার্মান গবেষক।

তারপর থেকে কেউই হেনড্রিক্সের গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলকে স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। তবে আর এক শ্রেণীর গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের বাঘেদের কাছে মানুষের মাংস প্রিয় হয়ে ওঠার আর একটা বড় কারণ হতে পারে গঙ্গায় ভেসে আসা মানুষের আধপোড়া দেহ। ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরি হওয়ার আগে গঙ্গার জলস্রোত সরাসরি সুন্দরবনের নদীগুলিতেও প্রবেশ করত। গঙ্গার পাশেই তখন অনেক শ্মশান ছিল। কলকাতার এরকমই অনেক শ্মশানের আধপোড়া দেহ জোয়ারের জলে ভাসতে ভাসতে সুন্দরবনে পৌঁছে যেত। বলাই বাহুল্য, এই আধপোড়া দেহ খেয়ে রয়্যাল বেঙ্গল নিজেদের ক্ষিদে মেটাত। তখন থেকেই মানুষের মাংসের স্বাদ বুঝতে শিখেছে এই ভয়ঙ্কার-সুন্দর প্রাণী।

স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশনের প্রাক্তন সেক্রেটারি এস ডিলন রিপ্লে আবার সুন্দরবনের বাঘেদের মানুষ-মাংস প্রীতি নিয়ে এক ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার মানুষকে নিজেদের খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পিছনে সুন্দরবনের মৎসজীবীদের ভূমিকা আছে।

সুন্দরববনে মাছ ধরার একটি অন্যতম প্রাচীন পদ্ধতি হল, খাঁড়ি এলাকায় জাল ফেলে ভাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা। জল সরে গেলে অনেক মাছ জালে আটকে যায়। রিপ্লের অনুমান, প্রথমে খাবারের লোভে ভাটার পর এই জালে ঝাঁপিয়ে পড়তে শেখে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এর পর জালের আশেপাশে থাকা মৎসজীবী এবং তাদের নৌকার দিকেও বাঘের নজর যায়। মাঝের গন্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়েও বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।

আর এক শ্রেণীর গবেষক বলেন, স্বাভাবিক খাদ্য তালিকায় থাকা বুনো শুয়োর, চিতল, বাঁদর, গোসাপ, জংলি মোরোগ ইত্যাদি শিকার করতে খুব একটা পটু নয় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। তাই বিকল্প খাদ্য হিসেবে তারা মানুষের মাংস পছন্দ করে। তাছাড়া বুনো শুয়োর বা চিতলের মতো বন্যপ্রাণীদের শিকার করা খুব সহজ নয়। বিশেষত চিতল তাদের সিং এবং শুয়োর নিজেদের ধারালো দাঁত দিয়ে অনেক সময় বাঘেদের পাল্টা আক্রমণ চালায়। সেই তুলনায় মানুষ শিকার বাঘের কাছে অনেক সহজ, কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে বাঘ নিয়ে যতটা গবেষণা হয়েছে বা হচ্ছে, সুন্দরবনে ততটা হয় না। ফলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নিয়ে আমরা যে সবটা জানি, সেটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। এখনও পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঘকে নিয়ে নানা রহস্য আছে। সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মতোই তার বিস্তার বিশাল। কাই এখনও সুন্দরবনের গ্রামগুলিতে বাঘের আক্রমণ থেকে বাঁচতে বনবিবির কাছে প্রার্থনা সেখানেকার বাসিন্দাদের অন্যতম ভরসা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আমার স্কুল: পাথরপ্রতিমা আনন্দলাল আদর্শ বিদ্যালয়

ইন্দ্রস্কুল প্রায় সবারই কাছেই প্রিয়। স্কুল এমনই একটি জায়গা যেখানে জীবনের শুরুর দিকে একটা বড় অংশ আমরা কাটাই, অনেক নতুন বন্ধু তৈরি...

ঘোড়ামারা: অভিশাপ না প্রশাসনিক অবহেলা? ক্ষয়িষ্ণু দ্বীপে ভাসমান কিছু প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন প্রত্যয় চৌধুরীজমি নেই, ঘর নেই, বাড়ি নেই। চারিদিকে শুধু জল আর জল! প্রকৃতি যে এরকম নিষ্ঠুর হতে পারে, তা...

নরহরিপুরে ত্রাণ বিলি

দুই সপ্তাহ হতে চলল, এখনও ইয়াস বিধ্বস্ত সমস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতিপূরণ পৌঁছায়নি। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও বিতরণ করা...

ইয়াস: ক্ষতিগ্রস্ত ঘোড়ামারা, পাথরপ্রতিমা বাজারেও ঢুকেছে জল

আম্ফানের পরেই একটি বিধ্বংসী ঝড়ের সাক্ষী হল সুন্দরবন। গত বছরের আম্ফানের মতো এবারও সাইক্লোন ইয়াসে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।সুন্দরবনের...

Recent Comments

error: Content is protected !!