বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৯, ২০২১
Home Politics ভিন রাজ্যের মালি দিয়ে বাংলার মাটিতে পদ্ম ফোটানো অসম্ভব

ভিন রাজ্যের মালি দিয়ে বাংলার মাটিতে পদ্ম ফোটানো অসম্ভব

১৮৫ Views

ইন্দ্রনীল দত্ত

বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে, ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া।  পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের ফল প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার আগে তেমনই অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয় নিয়ে দু’-চার লাইন লেখার তাগিদ অনুভব করছি। সম্প্রতি এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি ভিন রাজ্যে একটি বড় মিডিয়া সংস্থায় চাকরি করতেন। হঠাৎ শুনলাম, চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এমন সিদ্ধান্তের কারণ?’ তিনি মুখ বেজার করে বললেন, ‘ওরা জানে না মিডিয়া অফিস কীভাবে চালাতে হয়। মিডিয়া অফিসের কাজের পরিবেশের এক বিশেষ মেজাজ রয়েছে, কিন্তু ওরা সেটাকে মানতে না চেয়ে মিডিয়া অফিসে তথাকথিত কর্পোরেট কালচার ঢোকানোর চেষ্টা করছে, যেখানে প্রোডাকশন বলতে ম্যানেজমেন্ট বোঝে কিছু বিরক্তিকর সাপ্তাহিক মিটিং আর দিনের শেষে কে কয়টা কপি লিখছে সেটা। এভাবে কিছু হয় না।’ সেই সাংবাদিকের কথাটা এজন্যই ঠিক, কারণ যাবতীয় আধুনিক পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও ভিন রাজ্যের সেই আধুনিক মিডিয়া হাউজ এখন দর্শক ও পাঠকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এবার বিজেপি-র ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমার সেই সাংবাদিক বন্ধুটির কথাটাই প্রথমে মনে পড়ল।
আরও পড়ুন: অধীর গড়ে নিশ্চিহ্ন কংগ্রেস

এক একটা অফিসের কাজের যেমন আলাদা কালচার থাকে, তেমনি রাজ্যভেদে রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেটা সত্য। বিজেপি সেই বিষয়টা ভুলে গিয়ে এবার পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি বলয়ের বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে গো-বলয়ের রাজনীতির কালচারের ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে কেল্লা ফতে করতে চেয়েছিল এবং যথারীতি সফল হয়নি।

বিজেপির প্রথম ভুল ছিল রাজ্যস্তরের নেতাদের উপর ভরসা না করে দিল্লি এবং হিন্দি বলয়ের অন্য রাজ্যগুলোর নেতাদের উড়িয়ে এনে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। রাজ্যস্তরের যে নেতাদের উপর ভর করে ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে বিজেপি বিপুল সাফল্য পেয়েছিল, তাঁদেরই বিধানসভা ভোটে অপমানজনকভাবে উপেক্ষা করা হল। বিষয়টি দলের রাজ্যস্তরের নেতাদের এবং নিচুতলার কর্মীদের যেমন অসন্তুষ্ট করেছিল, তেমনি রাজ্যের সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের বাঙালি অস্মিতাকেও আঘাত করেছিল। ভোটের আগে চায়ের দোকানে, পাড়ার মোড়ে অনেক অরাজনৈতিক লোকজনকেই বলতে শুনেছি, ‘যে দল ভোটের প্রচারেই নিজের দলের বাঙালি নেতাদের উপরেই ভরসা করতে পারে না, তাদের আমরাই বা কী করে ভরসা করব? বিজেপি যদি ভোটে জেতে তাহলে মুখ্যমন্ত্রীও কি অন্য রাজ্য থেকে উড়িয়ে আনা হবে?’ বিষয়টি যেন অনেকটা ট্যুরিজম পলিটিক্স – ভিন রাজ্য থেকে নেতারা কিছুদিনের জন্য বাংলায় ভোটের প্রচারে ঘুরতে এলেন। প্রচারের রাশ এভাবে রাজ্যের বাঙালি নেতাদের হাত থেকে সরিয়ে ভিন রাজ্যের নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া যে মানুষ ভালভাবে নেয়নি, তা একসময় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও বুঝতে পেরেছিল। ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে তখন তারা নিয়ম করে বলতে শুরু করে, দল জিতলে মুখ্যমন্ত্রী বাংলার ভূমিপুত্রই হবেন, কিন্তু ততদিনে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন: আবার বাম বিপর্যয়

হিন্দি বলয় থেকে উড়ে আসা সেই নেতারা, যাঁরা বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালির রাজনৈতিক কালচার সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নন, তাঁরা এখানে এসে প্রচারের মূল সুরটি বেঁধে দিতে চাইলেন তাঁদের নিজেদের এলাকা অর্থাৎ গো-বলয়ের রাজনৈতিক কালচারের অনুসরণে। পাড়ায় পাড়ায় শোনা গেল জয় শ্রীরাম ধ্বনি। অথচ ওই নেতারা এটুকু জানার প্রয়োজন মনে করলেন না যে, বাঙালির ঠাকুরঘরে রামের নয়, রামকৃষ্ণের ছবি থাকে। রাম গো-বলয়ে দেবজ্ঞানে পূজিত হতে পারেন, কিন্তু এরাজ্যে তিনি শুধুই এক পৌরাণিক চরিত্র, যাঁকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতেও (সুকুমার রায় রচিত ‘লক্ষণের শক্তিশেল’ স্মর্তব্য) বাঙালির বিশেষ আপত্তি নেই। তথাকথিত রোমিও স্কোয়াড ভালো; না খারাপ, সেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু উত্তরপ্রদেশের সেই ‘বস্তু’ বাংলাতেও রমরম করে বিক্রি হবে, এতটা নিশ্চিত যোগী আদিত্যনাথ কী করে হলেন? এথেকেই স্পষ্ট ভিন রাজ্যের ওই নেতারা বাংলায় নির্বাচনী ভাষণ দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম হোমওয়ার্কটুকুও করে আসেননি। তাঁরা এক অলীক বাস্তবতায় মগ্ন ছিলেন এবং বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, নিজেদের রাজ্যে যেটা চলেছে, সেটা বাংলাতেও লোকে ‘খাবে’।
আরও পড়ুন: আসল খেলা কে খেললেন?

বিজেপি বাঙালি অস্মিতার যে জায়গাটায় আঘাত করেছিল, ঠিক সেই জায়গাটাই সুচতুরভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন প্রশান্ত কিশোরের সৌজন্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়’ স্লোগানে যে রাজ্যের মহিলারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তা এবার ভোটে মহিলাদের উল্লেখযোগ্য হারে ভোটদানে অংশ নেওয়ার ঘটনায় প্রতিফলিত। আর ফল প্রকাশের পর বোঝা যাচ্ছে মহিলাদের সেই ভোটের বড় অংশ কাদের শিবিরে গিয়েছে। পাশাপাশি ‘বহিরাগত’ স্লোগানও যে বাঙালি ভোটারদের প্রভাবিত করেছিল, ফল প্রকাশের পর সেটাও স্পষ্ট।

তবে এটাও ঘটনা যে, ২০১৪ সালের বিধানসভা ভোটে রাজ্যে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র তিনজন বিধায়ক। সেই সংখ্যাটি এবার একলাফে ৭০ ছাড়িয়েছে। ক্ষমতায় না এলেও বিজেপির রাজ্য রাজনীতিতে এটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক বিষয়। কারণ এই প্রথম তারা পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে। বাম ও কংগ্রেস কার্যত মুছে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতির মানচিত্র থেকে। বিজেপির অর্থের অভাব নেই এবং তারা একটি রেজিমেন্টেড পার্টি। তাই দলের নেতৃত্ব অবশ্যই এবারের ভুলগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে এবং তা থেকে শিক্ষা নেবে। এটাও স্পষ্ট যে, পরের বিধানসভা নির্বাচনে লড়াইটা হবে তৃণমূল কংগ্রেস বনাম বিজেপি অর্থাৎ ওয়ান টু ওয়ান। আর সেটা যে আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেসকে যথেষ্ট চাপে রাখবে, তা বলাইবাহুল্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

কুমীরের আক্রমণে আহত রাক্ষসখালীর যুবক

কুমীরের আক্রমণে গুরুতর আহত রাক্ষসখালীর এক যুবক। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ নদীতে মাছ ধরার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত যুবকের নাম...

আফগানিস্তানে খতম ২৬২ তালিবান, দেশজুড়ে কার্ফিউ

গত ২৪ ঘন্টায় আফগানিস্তানে মোট ২৬২ জন তালিবান জঙ্গিকে খতম করা হয়েছে। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই খবর জানিয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে, আফগান...

শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-২০ সিরিজে ডেবিউ করতে পারেন বরুণ চক্রবর্তী

আপাতত ইংল্যান্ড সফরে রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা সহ টিম ইন্ডিয়ার সিনিয়র খেলোয়াড়রা সেই স্কোয়াডে রয়েছেন। তাই শ্রীলঙ্কা সফরে...

কমছে কোভিড, সোমবার থেকে দিল্লিতে ১০০ শতাংশ ক্যাপাসিটি নিয়ে চলবে মেট্রো

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। খুলে যাচ্ছে দোকানপাট, সিনেমা হল। শনিবার দিল্লি সরকারের একটি অর্ডার থেকে জানা গিয়েছে, এবার দেশের রাজধানীতে...

Recent Comments

error: Content is protected !!