বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১
Home feature ‘লিফট’ এবং ‘প্যারাশুটের’ ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি

‘লিফট’ এবং ‘প্যারাশুটের’ ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি

২৮৭ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

দাদার অনেক অভিজ্ঞতা। পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। কিন্তু বর্তমানে তিনি শিশুসুলভ আচরণ করছেন। এবং ‘দাদার অনুগামীরাও’ তাই। যেখানে সেখানে পোস্টার সাঁটাচ্ছেন। আবার কেউ সেই পোস্টার পুড়িয়ে দিচ্ছেন। নিজেরাই তালগোল পাকাচ্ছেন। রোজ সন্ধ্যায় এই নিয়েই টিভিতে চর্চা। খবরের কাগজে পাতার পর পাতা জুড়ে তাই নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

পাঁচ বছর পর আমরা আরও একটা নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে। এই সময়ে ঠিক কী নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত? গত পাঁচ বছরের হিসাব-নিকাশ। কী পেলাম আর কী পেলাম না। রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে, কৃষক দরদী হওয়ার জন্য যেখানে নির্বাচনের আগে নেতারা ছুটে যান, সেখানে আদৌ কী উন্নয়ন হয়েছে? না কী সবটাই রেটরিক (rhetoric)? কৃষকরা কী ফসলের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন? শীতকালেও আলুর কেজি ৪০ টাকা। এই মহার্ঘ ফসলের কতটুকু টাকা প্রকৃত কৃষকদের পকেটে ঢুকছে?

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর কোনো সংবাদপত্র, খবরের চ্যানেলে পাবেন না। সবাই বিক্রি হয়ে গেছে। কোনো না কোনো দলের কাছে বা কোনো শিল্পপতির কাছে, যার আবার কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কিন্তু সেনসেশন তৈরি করতে হবে। ইয়োলো জার্নালিজম শেষ কথা। তথ্য চুলোয় যাক। অতএব, রোজ সন্ধ্যায় টিভির পর্দায় ক্যাওড়া কেত্তন। যা দেখে এক এক সময় মনে হয়, দলের থেকে, ভোটার বা জনগণের থেকে ব্যক্তি বড় হয়ে উঠেছে।

যে যত বড় নেতাই হোন না কেন, মানুষের সমর্থন ছাড়া তার মূল্য কিছু নেই। আর মানুষের এই সমর্থনটাকেই অনেকে দুর্বলতা বলে ভাবতে শুরু করেন। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় টেকেন ফর গ্রান্টেড। এটা রাজনীতি নয়। বা একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের পরিচয় নয়।

মুখে তিনি বারবার বলছেন, মানুষই তার সব। তবে এই তথাকথিত জননেতারা আদতে আত্ম অহংকারী হয়ে ওঠেন মানুষের সমর্থনে। আর দাদার অনুগামী নামে যে সমস্ত এনডেঞ্জার্ড স্পিসিজ রয়েছেন, তাদের এটাই ফুল টাইম কাজ। তাদের অফিস মিটিং, জুম কলে মিটিং, টার্গেট, বসের খিস্তি এসব শুনতে হয় না। ফলে তারা দাদার অনুগামী।

এবার দাদার প্রসঙ্গে আসা যাক। দাদার গোঁসা হয়েছে দলের এক তরুণ নেতাকে নিয়ে। এটা একটু বিচক্ষণ হলে আপনিও বুঝতে পারবেন কে সেই তরুণ নেতা। এর জন্য নিউটনের গতি সূত্র জানার প্রয়োজন নেই। দাদার মূল বক্তব্য এটাই, চুলে জেল দেওয়া, ব্র্যান্ডেড চশমা পরা সেই তরুণ নেতা লিফটে বা এস্কেলেটরে চড়ে বা প্যারাশুটে উড়ে এসে হঠাৎ করে রাজনীতির ময়দানে উদয় হয়েছেন। তাকে কোনো পরিশ্রম করতে হয়নি। অর্থাৎ দাদা কী বলতে চাইছেন আশাকরি এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন। নেপোটিজম। সুশান্ত সিং রাজপুতের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর (সব মিডিয়ায় লেখা হয় আত্মহত্যা, যা ডাহা ভুল) এই শব্দের এতটাই প্রয়োগ হয়েছে যে প্যানডেমিকের পাশাপাশি নেপোটিজম হয়ে উঠেছে গুগলে সর্বাধিকবার সার্চ করা এবছরের অন্যতম শব্দ।

হাঁসালেন দাদা! সত্যি! প্রদীপের নিচে অন্ধকার বলে না। এটাও তো ঠিক তাই। দাদা এই কথাটা কীভাবে বেমালুম ভুলে গেলেন। দাদার বাবা, অর্থাৎ আমাদের শ্রদ্ধেয় কাকু, তিনিও তো প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী, দলের প্রভাবশালী নেতা, দলের জেলা প্রেসিডেন্ট, বহু বছরের পোড়খাওয়া সাংসদ। কাকু যদি একথাটা বলতেন, তাও না হয় তর্কের খাতিরে সেটা কিছুটা মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু দাদার কথা জাস্ট মেনে নেওয়া যায় না। যে লিফট এবং প্যারাশুটের কথা তিনি বলেছেন, সেটা কী তিনিও ব্যবহার করেননি? বাবার যদি এই রাজনৈতিক পরিচয় না থাকতো, রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান না হলে তিনি এই অল্প বয়সে এত প্রভাবশালী নেতা হতে পারতেন? না তার এই দাদার অনুগামী তৈরি হত? তার হাতে কী যাদু কাঠি ছিল যা দেখে মানুষ প্রতিটা নির্বাচনে তাকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছেন?

আর যে তরুণ নেতার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে তার এত আপত্তি, তিনি নিজের এলাকায় ভোটে দাঁড়াননি। বরং সম্পূর্ণ নতুন একটা এলাকায় গিয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টের সদস্য হয়েছেন। কেবলমাত্র তিনি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান বলে এসব করতে পেরেছেন বললে এই তরুণ নেতার দক্ষতাকে খাটো করা হবে। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, আজকের ভারত অনেক বদলে গিয়েছে। পদবী দেখেই যদি সর্বত্র মানুষ কোনো প্রার্থীকে ভোট দিতেন, তাহলে রাহুল গান্ধী মতো নেতারা এদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠতেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলে কেউ থাকতেন না। বা কানহাইয়া কুমার বলে কেউ বিপুল জনসমর্থন আদায় করতে পারতেন না। তাছাড়া নেপোটিজম বা স্বজনপোষণ ভারতীয় রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রেথিত। এটা রাতারাতি উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। যতদিন না শিক্ষিত সমাজের একটা বড় অংশ রাজনীতিতে যোগদান করছে, রাজনীতি একটা বিকল্প পেশা হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত এই ট্রেন্ড চলবে। জাস্টিন ট্রুডোর মতো তরুণ প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার মতো পরিকাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখনও তৈরি হয়নি। এদেশে এখনও মাথার চুল না পাকা পর্যন্ত কাউকে অভিজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হয় না।

দাদার আরও আপত্তির বিষয় হিসেবে একটা ব্যাপার অনুমান করা হচ্ছে। একটা রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কৌশল ঠিক করছেন একজন প্রফেশনাল, যিনি পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে পরিচিত। দাদার চেয়ে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হয়তো কম। টেক স্যাভি, ইংরেজিতে দক্ষ এই স্ট্র্যাটেজিস্ট ইতিমধ্যে দেশের অন্যান্য প্রান্তে সাফল্যের নিদর্শন তৈরি করেছেন। এমনি এমনি তো রাজনৈতিক দলগুলি লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে তার সার্ভিস নিচ্ছে না। এই পলিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস্টের কোনো দক্ষতা নেই, এটা বললে ভুল হবে।

চিরাচরিত প্রথার রাজনীতি আর বর্তমান রাজনীতির ধরণ বদলেছে, এটা দাদাকে মানতে হবে। সুতরাং, ওই পেশাদার কোনো নির্বাচনে না দাঁড়ালেও তার পেশাদারী অভিজ্ঞতা যেকোনো দলের কাজে লাগতে পারে। সেটা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। বয়স বেশি হলে একজন সব জেনে যান, আর বয়স কম হলে জ্ঞান কম থাকে, এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। সবার কাছেই শেখার মতো অনেক জিনিস থাকে। কেউ কখনো দাবি করতে পারেন না, তিনি সব জেনে গিয়েছেন, সব বুঝে গিয়েছেন, নতুন করে কোনো শেখার নেই।

এদিকে দল এবং সমর্থকদের এক প্রকার ধোঁয়াশার মধ্যে রেখে দাদা একের পর এক অরাজনৈতিক সভা করে চলেছেন। মাইলেজ নিচ্ছেন। টিভি, খবরের কাগজে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে তার ছবি এবং ‘বাণী’। তাতে জনগণের কী লাভ? প্লিজ, একবার ভাবুন। ভোটার হিসেবে ভাবুন। দাদা নিজের প্রচারটা ভালো করছেন। আর যে ভোটার পাঁচ বছর আগে অনেক আশা নিয়ে ভোট দিয়েছিলেন, তার কথা কে মনে রাখে? এই লকডাউন এবং মহামারিতে এত মানুষ কর্মহীন, প্রায় গোটা পশ্চিমবঙ্গটাই ভিনরাজ্যে যায় রোজগার করতে। বিশেষত যারা শ্রমিক, তারা এখন ঘরে ফিরে এসেছেন। কাজ নেই। টাকা নেই। তাদের নিয়ে দাদা কিছু বলেছেন বা এখন বলছেন? দাদা নিজে জেলার নেতা। ফলে তিনি গ্রামের চিত্র ভালোভাবে বুঝবেন। কিন্তু তিনি কী করছেন? দলের সঙ্গে বিরোধের আছিলায় নিজের প্রচারটা ভালোভাবে করে ফেলছেন। লাইমলাইটে থাকছেন। দলের চেয়ে ইগো বড়, জনগণের চেয়ে ব্যক্তি বড়।

আর একটা কথা। তার সাথে দলীয় নেতৃত্বের গোঁসা হওয়ার কারণে অন্য এক দলে তার যোগদান নিয়ে প্রতিদিন তীব্র জল্পনা করা হচ্ছে। এমন একটা দল, যারা কৃষকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে, এমন একটা দল যারা বিভেদের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, নাগরিকত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে রাজনীতি করে, বাঙালিদের সেন্টিমেন্টে আঘাত করা সেই দলে দাদার যোগদান নিয়ে দিনের পর দিন যে জল্পনা হচ্ছে, দাদা কী সেটা উপভোগ করছেন? যে দলের সদস্য হিসেবে তার নেতা হয়ে ওঠা, সেই দলের সদস্যপদ তিনি এখনও ত্যাগ করেননি। ফলে তার কী উচিত নয় এই জল্পনার অবসান ঘটানো? অন্তত এটা বলা কী উচিত নয় যে দলীয় নেতৃত্বের সাথে আমার মতভেদ তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে এই পরিস্থিতিতে যে অন্য একটি দলে আমার যোগদান নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা সঠিক নয়? কিন্তু তিনি তেমন কিছু বলছেন না। তার মুখে কুলুপ। সমাজবিজ্ঞানে বলা হয়, নিরবতা হল সমর্থনের অপর নাম। এক্ষেত্রে দাদার নিরবতা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটা তিনি নিজের মুখে বললে ভালো হয়। নাহলে যে সর্বনাশ বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে হয়েছে, তা বাড়বে বৈ কমবে না। বাঙালি একসময় উদারচেতা মানসিকতার জন্য সমগ্র বিশ্বে পরিচিত ছিল। অথচ সেই বাঙালি ছেলেপুলেরা আজ ভীষণভাবে বিভেদের রাজনীতিতে বিশ্বাস করছে। ফেসবুক খুললেই দেখা যায়। গোষ্ঠী বিরোধী মন্তব্য। ট্রলিং। উগ্র মানসিকতা। এ কী! অন্য কোনো গোষ্ঠীর মানুষ নয়! বাঙালিরাই এটা করছেন। অবাক হতেই হয় এসব দেখে।

সব শেষে, ভোটের আগে উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হোক, কী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে আর কী হয়নি সেসব নিয়ে আলোচনা হোক। বিশেষত সুন্দরবনের অবস্থা এখন শোচনীয়। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে যে এলাকা পরিচিত, সেটা এখন গোটা দেশের লেবার ফ্যাক্টরি হয়ে উঠেছে। রোজগারের জন্য তাদের গ্রাম ছাড়া হতে হচ্ছে। স্কুল ড্রপআউটের সংখ্যা প্রচুর। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের পরে অনেকেই আর পড়াশুনা করে না। এক প্রকার বাধ্য হয়ে সবাই কেরল, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করতে যাচ্ছে। বাড়িতে বৌ-বাচ্চা, বৃদ্ধ বাবা-মাকে ফেলে হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো রাজ্যে তারা শখ করে কাজ করতে যায় না। কারুর নিজের জমি আছে, কেউ ভাগচাষী বা জমি বন্ধক নিয়ে চাষ করে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই কৃষিকাজ আর লাভজনক নয়। কৃষি ভিত্তিক শিল্প এখনও সোনার পাথরবাটি। মাছ চাষ, সব্জি চাষ করেও উপযুক্ত মূল্য বাজারে পান না কৃষকরা। এটা নিয়ে কেউ ভাবছেন না। ভোট আসে, ভোট যায়, কিন্তু সুন্দরবন থাকে সেই অন্ধকারেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

স্যামসনের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং, তবুও শেষ হাসি হাসল পাঞ্জাব

স্কোরবোর্ড বলছে, আইপিএল ২০২১-এর চতুর্থ ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ রানে হারিয়ে দিয়েছে পাঞ্জাব কিংস। তবে সেটা দেখে ম্যাচের আসল ছবি বোঝা যাবে...

ধর্নায় বসবেন মমতা

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রচারের উপর 24 ঘন্টার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই...

মানুষ মরে এভাবেই, কেউ খোঁজ রাখে না

বিশ্বজিৎ মান্না ধরুন আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে, বাজারের থলে হাতে নিয়ে বেরোলেন। আপনার বাড়ির লোক বা আপনি কী...

ফের ক্ষমতায় দিদি, তবে বিজেপির আসন বাড়বে: বলছে সমীক্ষা

বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম বিরোধী দল হিসাবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেন্দ্রের শাসক দলের দাবি, রাজ্যে এবার তারাই ক্ষমতায় আসতে চলেছে।...

Recent Comments

error: Content is protected !!