১৪ ফেব্রুয়ারির লেখা নয়

১৭১ Views

শুভ সরকার

ভালোবাসা একটা ছোট্ট স্টেশনের মতো।

আর যারা ভাবছো, সেই স্টেশন ছেড়ে যাওয়াটার নামই হলো চলে যাওয়া, তারা ঠিক নয়।

আমার একটা স্টেশন রয়েছে আজও। একটু আগের মোড় থেকেই তার বর্ণনা দিই? দুটো ঘিঞ্জি ঘিঞ্জি রাস্তা টি-এর মতো এসে মিশেছে। আর জোড়া লাগার যে জায়গাটা, সেখানে কোনাকুনি দুটো অটো স্ট্যান্ড। স্ট্যান্ড বলতে, চার পাঁচটা করে অটো দাঁড়ানো থাকে সব সময়। তার একদিকে স্টেশন, আরেকদিকে এয়ারপোর্ট। মস্ত বড় ব্যাপার। অটো করে স্টেশন যাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তার প্রয়োজন পড়ে না। মাঝখান থেকে পাঁচটা টাকা খরচ হয়ে যায়। ওইটুকু তো রাস্তা। বাঁ পাশের একদম প্রথম দোকানটা জামা কাপড়ের। শপিং মল চালু হওয়ার আগে, প্রস্তর যুগে সেখানে সারা বছর ভিড় লেগে থাকত। পুজোর সময় মা ঠেলে ঠুলে কাউন্টারের সামনে যাওয়ার চেষ্টা করত আর আমি যুদ্ধ দেখতাম নিরাপদ দূরত্ব থেকে। এখন কাঠের তৈরি বিশাল কাউন্টারটার ওপাশে পাঁচজন বসে থাকে ঠায়। তাদের মধ্যে একজন আবার খুব বেগুনি খেতে ভালোবাসে। যতবার দোকানটার পাশ দিয়ে যাই, শুনি বলছে, আজকের বেগুনিটা কেমন জানি ন্যতানো। অথবা আজকেরটায় পুরোটাই বেসন। শালার বেগুন কই।  দোকানের বিককিরি কমে যাওয়ায় ওই একমাত্র খুশি কর্মচারী বোধহয়। বাকিরা কেউ উদাসীন। কেউ বিমর্ষ। একদিন একজন বলছিল, লোক হয় না। মালিক আর আসেই না দোকানে। এই যে মালিক আর আসেই না-কথাটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। সত্যিই তো। মালিক আর… মালিক আর আসেই না যে। এলেই বা কি বলতাম?

কাপড়ের দোকানটার পাশে চায়ের দোকান। চপের দোকান। পরপর। আবার জামাকাপড়ের দোকান। এবারেরগুলো ছোট ছোট। আমাদের স্কুলের একজন স্যারের দোকানও ছিল। নাঁকি নাঁকি গলায় যখন তখন ধমকে দেওয়া সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ স্যার জাদুমন্ত্রে বদলে গিয়ে কিভাবে তেলতেলে গলায় স্যান্ডো গেঞ্জি বিক্রি করতেন খদ্দেরদের, প্রায়শই বিকেলে সেটা দেখতে চলে যেতাম দোকানটার সামনে। তারপর মনিহারি দোকান, মিষ্টির দোকান। ইমিটেশনের গয়না। এসবের মধ্যেই মুখ লুকিয়ে থাকত একটা বইয়ের দোকানে। কেউ যেত না। কেন যে কেউ যেত না, দোকানদারটা বড়ো ভালো ছিল গো। কোনো বই চাইলে আনিয়ে দিত কলেজ স্ট্রিট থেকে। কমিশনও দিত। একটা বেশ বড় সাইজের ঘর, তার তিন দেওয়ালে কাঠের তৈরি আলমারি। সামনে কাঁচ দেওয়া। পুরোনো পুরোনো ভাব। আমার খুব ইচ্ছা ছিল, আরেকটু খাতির জমলে দোকানদারকে হাত করে দোকানের ভিতরে ঢুকে পড়ার পারমিশন আদায় করে নিতে হবে। আরেকটু খাতির জমলে, আরেকটু। আরো খাতির জমার আগেই আমি কলেজ স্ট্রিট চিনে গেলাম যে!

এরপর আরেকটা মোড় চলে আসে। তার ডানদিক বাদিক, দুদিক দিয়েই কাঁচা বাজার। রাস্তার ওপর বাজার সুলভ আবর্জনার ঢিবি। যখনই যাই, দুয়েকটা গোরুকে নিশ্চিন্তে জাবর কাটতে দেখা যেত। সকালের দিকে যেমনটা ভিড়, বা সন্ধ্যায়, একটু রাত বাড়লে আর ততটাও নয়।তবুও পলিথিনের ছাদ থেকে হলুদ হলুদ বাল্ব ঝুলিয়ে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকত। একটু রাত করে ট্রেন থেকে নামা অফিসবাবু, কলকাতায় দোকান সেরে আসা ব্যবসায়ীদের তো ওরাই ভরসা। বিকিকিনি হতো। টিপে টিপে বেগুন নিত লোকজন। সকাল থেকেই টাটকা শাক বিক্রি করছে যে লোকটা, রাত দশটার লোকাল থেকে নেমেও তার কাছ থেকে টাটকা শাকই কিনত অফিসবাবুরা। কোনো একজন সৌখিন পুরোনো দিনের হিন্দি গান বাজাত। তার দোকানের চাল থেকে ঝুলতে গান চালাবার মেশিন। পাশের দোকান্দারগুলোর কি মজা, কেমন বিনা পয়সায়, আমি ভাবতাম। বাজারে ঢোকা বা না ঢোকা নিজস্ব ইচ্ছার ব্যাপার। ইচ্ছা করলে বাজার এড়িয়ে সোজা খানিকটা গেলেই স্টেশন। তার সামনে জায়গা বেশি নেই। অনেকটা ধরো, এই রাস্তা চলছে চলছে, হট করে দেখলে তোমার পথ বন্ধ। সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা স্টেশন। সেরকমই। বাঁ পাশে একটা ভাতের হোটেল ছিল। কেউ খেত না। ডানপাশে একটা ফাস্ট ফুডের দোকান। সব্বাই সেখানেই। প্রথমে রোল চাউমিন মোগলাই। ক্রমে ক্রমে বিরিয়ানিও। ফ্রাইড রাইস বললে ভাতের মধ্যে এগরোলে দেওয়ার স্যালাড কুচি দিয়ে ভেজে দিত। হেব্বি লাগত গরম গরম। মিষ্টির দোকান ছিল একটা। তাতে জাল লাগানো শোকেস ছিল। বিজয়ার পর যখন কোনো নতুন কুটুম স্টেশনে নামত, ওই দোকানটাই ছিল ফার্স্ট চয়েস। পরেরবার থেকে অবশ্য সাবধান হয়ে যেত। বাজারের মধ্যে ঢুকে ভালো মিষ্টির দোকানের খোঁজ করত।

স্টেশনে ঢোকার মুখে তিন ধাপ সিঁড়ি। সিঁড়িতে পরপর পান বিড়ি সিগারেটের দোকান। ওই মুলুকের সবথেকে বড়লোক ব্যবসায়ী ছিল বোধহয় ওরাই। অন্তত দোকানের  ভিড় দেখে তো তেমনটাই মনে হতো। সিঁড়ি ছাড়িয়ে টিকিট কাউন্টার। সেখানে কোনো ভিড় হতো না। অসম্ভব ঝুল পড়া জলের ওপারে কে বসে আছে, বুঝতেও পারতাম না ছাতা। খালি দৈববাণীর মতো একটা হাত প্রয়োজনীয় টিকিট বাড়িয়ে দিত কাটা অংশটা দিয়ে। কাউন্টার চত্ত্বর পেরিয়ে স্টেশনে পা। আর তারপর?

বারবার টিকিট কাউন্টার অবধি পৌছেও কিছুতেই স্টেশন অবধি পা না রাখতে পারা। তাকেই বোধহয় ছেড়ে যাওয়া বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!