রবিবার, জুন ২০, ২০২১
Home feature সুন্দরবন ছেড়ে ম্যানগ্রোভ দিচ্ছে পাড়ি অজানার পথে

সুন্দরবন ছেড়ে ম্যানগ্রোভ দিচ্ছে পাড়ি অজানার পথে

২৫১ Views

সাগ্নিক চৌধুরী

আমাগো বাংলাদেশের এক কবি আবু জাফর বলেছিলেন “আমাদের সুন্দরবন, এজে সাত রাজার ধন।”

অরণ্য গভীর আরও গভীরে যেন তলিয়ে যায় মনের অতলে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, উষ্ণয়ানের ফলে একদিকে যেমন গরম বাড়ছে, তেমন অন্যদিকে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে ম্যানগ্রোভ সরে যাচ্ছে সুন্দরবন থেকে আরও দূরে। প্রকৃতির ভারসাম্য এবং পরিবর্তন এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ম্যানগ্রোভ অথবা সুন্দরী গাছের এইভাবে সুন্দরবন থেকে দূরে চলে যাওয়া নিয়ে নানা মুনির নানান মত। কেউ বলছেন ওখানের অনুকূল পরিবেশের অভাবে আস্তে আস্তে গঙ্গার জলে ভাসতে ভাসতে এরা চলে আসছে হাওড়াতে। এটি যে শুধু সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর তা শুধু নয় বরং একই সাথে সারাদেশের ম্যানগ্রোভ অরণ্য বা সুন্দরী গাছের জন্যও অশনি সংকেত তা বলাই বাহুল্য, কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? আসুন একটু বিশদে জেনে নেওয়া যাক।

তবে এই আলোচনা শুরু করার আগে একটু বিজ্ঞানটা জেনে নেওয়া দরকার, ম্যানগ্রোভ অরণ্য বা লবণাক্ত গাছ সাধারণত সমুদ্র উপকূল অঞ্চলের নোনা বা লবণাক্ত জমিতে জন্মায়। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম সনেরাশিয়া গ্রিফিথি (Sonneratia Griffithii)। এই ম্যানগ্রোভ গাছের মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া, কেওড়া। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার বদ্বীপের সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এই গাছের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ছড়ানো মূল তন্ত্রের উর্ধমূখী শাখা যা ভুমি/জলতলের উপরে জেগে থাকে এবং এর ডগায় নিউমাটাপোর নামে শ্বাসছিদ্র থাকে। মাটিতে পড়লেই সরাসরি গেঁথে মূল বিস্তার করতে পারে। মূলত সুন্দরী গাছ থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে সুন্দরবন। আর সব থেকে বড় কথা হল এই সুন্দরবন যতটা এদেশে আছে ঠিক ততটাই রয়েছে ওদেশে মানে বাংলাদেশে।

কিন্তু এই সুবিশাল সুন্দরবনের সৌন্দর্য আজ ক্ষতির মুখে। ক্ষয়িষ্ণু মাটির ফলে ধীরে ধীরে নেমে আসছে অবক্ষয়ের ছায়া আর এই নিয়ে প্রমাদ গুনছেন বিজ্ঞানীরা। কেননা এতে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। বনাঞ্চলের ৫১ শতাংশ জুড়ে সুন্দরবনের, বন থেকে আসা মোট আয়ে অবদান প্রায় ৪১ শতাংশ এবং কাঠ ও জ্বালানী উৎপাদনে অবদান প্রায় ৪৫ শতাংশ (বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, ১৯৯৫)। অনেকগুলি শিল্প (যেমনঃ নিউজপ্রিন্ট, দেশলাই, হার্ডবোর্ড, নৌকা, আসবাবপত্র) সুন্দরবন থেকে প্রাপ্ত কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন অ-কাঠজাত সম্পদ এবং বনায়ণ কমপক্ষে তিন লক্ষ উপকূলবর্তী জনসংখ্যার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উৎপাদনমূখী ভূমিকার পাশাপাশি সুন্দরবন, ঘূর্ণিঝড়প্রবণ বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জনসংখ্যা ও তাদের সম্পদের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও এই লবনাক্ত গাছ বাতাসের অতিরিক্ত কার্বন-ড্রাই-অক্সাইড শোষণ করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

এই ক্ষতি থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষকেও তুলে নিতে হবে নিজের হাতে দায়িত্ব। আজ যদি এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য একটু একটু করে হারিয়ে যায় তাহলে এখানকার মানুষের যে শুধু অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে তাই নয় বরং এর প্রভাব রাজ্যের তথা দেশের পরিবেশ দূষণের মাত্রাতে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আমার স্কুল: পাথরপ্রতিমা আনন্দলাল আদর্শ বিদ্যালয়

ইন্দ্রস্কুল প্রায় সবারই কাছেই প্রিয়। স্কুল এমনই একটি জায়গা যেখানে জীবনের শুরুর দিকে একটা বড় অংশ আমরা কাটাই, অনেক নতুন বন্ধু তৈরি...

ঘোড়ামারা: অভিশাপ না প্রশাসনিক অবহেলা? ক্ষয়িষ্ণু দ্বীপে ভাসমান কিছু প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন প্রত্যয় চৌধুরীজমি নেই, ঘর নেই, বাড়ি নেই। চারিদিকে শুধু জল আর জল! প্রকৃতি যে এরকম নিষ্ঠুর হতে পারে, তা...

নরহরিপুরে ত্রাণ বিলি

দুই সপ্তাহ হতে চলল, এখনও ইয়াস বিধ্বস্ত সমস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতিপূরণ পৌঁছায়নি। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও বিতরণ করা...

ইয়াস: ক্ষতিগ্রস্ত ঘোড়ামারা, পাথরপ্রতিমা বাজারেও ঢুকেছে জল

আম্ফানের পরেই একটি বিধ্বংসী ঝড়ের সাক্ষী হল সুন্দরবন। গত বছরের আম্ফানের মতো এবারও সাইক্লোন ইয়াসে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।সুন্দরবনের...

Recent Comments

error: Content is protected !!