সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০
Home country ক্ষতবিক্ষত হয়েও প্রাচীরের ভূমিকায় বাংলাদেশের সুন্দরবন

ক্ষতবিক্ষত হয়েও প্রাচীরের ভূমিকায় বাংলাদেশের সুন্দরবন

২৮৫ Views

শিতাংশু ভৌমিক অংকুর
(রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী ও সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন কর্মী)

বাঙালির দুয়ারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে প্রাচীরের ভূমিকায় দাড়িয়ে আছে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক  লীলাভূমি  আমাদের সুন্দরবন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বন্য প্রাণী ও বন সম্পদে সমৃদ্ধ বনগুলোর মধ্যে প্রথমে যে কয়েকটি বনের নাম উঠে আসে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। জল-কাদামাটিময় ভূমি আর সবুজ-নিস্তব্ধ এই বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী; ধারণা করা হয়, এই বৃক্ষের নামানুসারে সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়। এই বনটি সুন্দরবন  বা গরান উপকূলীয় বন নামেও পরিচিত। সুন্দরবন সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধশালী হওয়ায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে সুন্দরবনকে স্বীকৃতি দেয়।


বৃহত্তর সুন্দরবনের বাংলাদেশে ও ভারতীয় অংশ একই নিরবছিন্ন ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে তালিকাভুক্ত হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন ও সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান। প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বাংলাদেশে অবস্থিত এবং এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ভারতে অবস্থিত। বন অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার যা বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার সর্বশেষ ২০১৫ সালের তথ্যমতে, ২০০ বছর পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কিলোমিটার। সে সময় এ বনের নিয়ন্ত্রণ ছিল জমিদারদের হাতে, ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম সুন্দরবনের স্বত্বাধিকার অর্জন করে। ১৮৩০ সাল থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ লিজ দেয়ার প্রচলন শুরু হয় এবং সর্বপ্রথম ১৮৩১ সালে সুন্দরবনের মানচিত্র প্রকাশিত হয়। ইউরোপিয়ানরা এই লিজ গ্রহণ করে অমূল্য এ বনাঞ্চলকে আবাদি জমিতে রূপান্তর করতে থাকে। রূপান্তরের সময় তারা বৃক্ষ ও ছোট ছোট গুল্ম কেটে ফেলতে শুরু করে। ফলে সুন্দরবনের আয়তন ব্যাপক হারে কমতে থাকে, পরবর্তীতে ১৮৭৮ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয় ও ১৮৭৯ সালে সুন্দরবনের দায়-দায়িত্ব বন বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়।

সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের মোহনায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই বিস্তীর্ণ বন। দেশে সংরক্ষিত বনের শতকরা ৫১ ভাগই সুন্দরবন বনাঞ্চল। বাংলাদেশের দক্ষিণের ৩টি জেলা যথা: খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় সুন্দরবন অবস্থিত। এ ছাড়া বৈজ্ঞানিক, নৃতত্ত্ব,  প্রত্নতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সুন্দরবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। বিশ্ববিখ্যাত বিরল প্রজাতির রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই বনের প্রধান আকর্ষণ। অসংখ্য নদী-নালা ও খাল জালের মতো জড়িয়ে আছে এই বনের মধ্যে যা বন প্রকৃতির এক অপরূপ চিত্তাকর্ষক ও বিস্ময়কর অবদান। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

২০০৪ সালে  বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বাঘের পদচিহ্নের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের বন বিভাগের একটি জরিপ পরিচালিত হয় এবং ওই জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। পরবর্তীতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ ও ভারতের সহায়তায় ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ক্যাপচার ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে জানা যায় সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটারে বাঘ আছে ১০৬টি যা ১০ বছর আগের জরিপের চার ভাগের এক ভাগেরও কম। এ ছাড়া হরিণের সংখ্যা ১ লাখ থেকে দেড় লাখ, বানরের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার, বন্য শুকরের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার, কুমিরের সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ শতাধিক ও অন্যান্য প্রাণী বিদ্যমান। বিলুপ্ত প্রায় গন্ডার, চিতাবাঘ, ওলবাঘ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত সুন্দরবন। সুন্দরবনে প্রায় ২৭০ প্রজাতির আবাসিক এবং ৫০ প্রজাতির বিচরণশীল পাখির দেখা মেলে। ৯ প্রজাতির মাছরাঙাসহ সুন্দরবনে রয়েছে কাঠঠোকরা, ভগীরথ, পেঁচা, মধুপায়ী, বুলবুল, শালিক, ফিঙে, বাবুই, ঘুঘু, বেনে বৌ, মুনিয়া, টুনটুনিসহ নানা ধরনের ছোট ছোট গায়ক পাখি।

এছাড়া সুন্দরবনের বুক চিরে বয়ে চলেছে ৪০০ নদীনালা এবং ২০০ খাল। এসব নদী ও খালে রয়েছে প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে রক্ষায় নদীগুলোর ভূমিকা অন্যতম। কিন্তু বর্তমানে সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে কয়লা ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল নদীর পানি দূষণের অন্যতম কারণ। ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার তেল নিয়ে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনায় সুন্দরবনের ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তেল, যা পরবর্তীতে জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রস্তাবিত রামপাল বিদু্যৎকেন্দ্রও ভবিষ্যতে সুন্দরবনের জন্য হুমকি হতে পারে। কারণ বিদু্যৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল যেমন- কয়লা নদী দিয়ে বহন করতে হবে। এ ছাড়া বিদু্যৎ উৎপাদনের বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও বা গরম পানি নদীর পানির সঙ্গে মিশে নদীর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই সুন্দর বন কে বাঁচাতে হলে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারত সরকার এবং দুই দেশের জনকে সচেতন হতে হবে। তাহলেই আমার বিশ্বাস সুন্দরবন ভালো থাকবে আর সুন্দরবন ভালো থাকলে ভালো থাকবে বাংলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

এক ওভারে পাঁচ ছক্কা: আইপিএল ২০২০-তে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন রাহুল তেওয়াটিয়া

রবিবার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) একটি ম্যাচে শার্জায় মুখোমুখি হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস এবং কিংস ইলেভন পাঞ্জাব। এই ম্যাচে ব্যাটিং দক্ষতার মাধ্যমে চাঞ্চল্য...

করোনা আক্রান্ত পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা, আরোগ্য কামনায় পূজার আয়োজন করল তৃণমূল

বিশ্বজিৎ মান্না পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল তৃণমূল কংগ্রেস।...

আইপিএল ২০২০: সম্পূর্ণ সূচি, তারিখ, ভেনু

বহু প্রতিক্ষিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে ভারতের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে আইপিএল। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে...

বাবর আজমকে দিশাহীন মনে হচ্ছে: শোয়েব আখতার

ম্যাঞ্চেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠি দ্বিতীয় টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৬ রানের টার্গেট সহজে পৌঁছে গিয়ে ৫ উইকেটে জয় অর্জন করেছে আয়োজক...

Recent Comments

error: Content is protected !!