বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১
Home village ছেলে, বৌমা, নাতনির প্রাণ কেড়েছে সাইক্লোন, ক্যানসারে মারা গিয়েছেন স্ত্রী, এখন ভাঙা...

ছেলে, বৌমা, নাতনির প্রাণ কেড়েছে সাইক্লোন, ক্যানসারে মারা গিয়েছেন স্ত্রী, এখন ভাঙা ঘরে একাই থাকেন অনুকূল

৪৩৭ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

চলতি বছরের মে মাসের কথা। সুন্দরবনের ছোট মোল্লাখালির কালীদাসপুর গ্রামের বাসিন্দা স্বাতীলতা মণ্ডল শুনেছেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সরকারি আধিকারিকরা আসন্ন এক ঝড় সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করছেন।

সুন্দরবনের উপকূলবর্তী অঞ্চলে সাইক্লোন, ঝড় এসব নতুন কিছু নয়। সুন্দরবনের বাসিন্দারা এরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে পরিচিত। তাই আর একটা সাধারণ ঝড়ের মতো এটিকেও গুলিয়ে ফেলেছিলেন স্বাতীলতা। তিনি বলেন, আমি আয়লার মধ্যেও টিকে থেকেছি। সেটার চেয়ে খারাপ কিছু আর কী হতে পারে?

অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখেছে সুন্দরবন। কয়েকমাস আগের আম্ফানের মতো সুপার সাইক্লোন আয়লার কথাও অনেকে এখনও ভুলতে পারেননি। ভুলে যাওয়া সম্ভবও নয়। ২০১০ সালের সেই ঝড় আয়লা প্রায় গোটা সুন্দরবনকে তছনছ করে দিয়েছিল। মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দুর্যোগে শতাধিক মৃত্যু হয়েছিল। নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল ৪০,০০০-এরও বেশি বাড়ি। তবে ২০২০ সালের ২১ মে যে ছবি স্বাতীলতা নিজের চোখে দেখেছেন, তা তার অতীতের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। সেই অভিশপ্ত রাতে প্রকৃতির রোষাণল থেকে বাঁচতে তিনি অন্যান্যদের মতো স্থানীয় একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরকম কোনো দৃশ্য তিনি এর আগে দেখেননি। গোটা আকাশ তখন ঘন, কালো মেঘে ছেয়ে গিয়েছে। নদীর জল রীতিমতো ফুঁসছে।

স্বাতীলতা বলেন, আমি দেখলাম অ্যাসবেস্টস হাওয়ায় উড়ে চলে যাচ্ছে। নদীর তীরে বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। দশ বছর আগের আয়লার চেয়ে এর (আম্ফান) তীব্রতা অনেক বেশি।

আম্ফানে কালীদাসপুর গ্রামে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ি

২২ মে ঝড়ের তীব্রতা কমে যাওয়ার পর বাড়ি ফেরেন স্বাতীলতা। তার বাড়ির ছাউনি ভেঙে গিয়েছিল। মুরগী খামারের উপর গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুর্যোগে তার ছয়টি মুরগী মারা যায়। তবে তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছিল তার জমিতে। তার দেড় বিঘা মতো ধান জমি ছিল রোজগারের মূল ভরসা। কিন্তু আম্ফানের জেরে নদীর নোনা জল গোটা জমিটাকেই ভাসিয়ে দিয়েছিল। ফসল তো নষ্ট হয়েছেই, সেই সাথে জমির উর্বরতা অনেকটাই ধাক্কা খেয়েছে। কারণ জমির উর্বর মাটিতে মিশে গিয়েছে নদীর নোনা জল, এতে ফসল আগের মতো ফসল ফলতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

সুন্দরবনের একটি প্রত্যন্ত এলাকা কালীদাসপুর। মূল ভূখণ্ড থেকে নৌকায় করে যেতে ঘন্টা পাঁচেক সময় লাগে। তারপর সেখান থেকে ঘন্টা দেড়েকের পথ পেরোনোর পর ছোটো মোল্লাখালি ফেরিঘাট। এটা সুন্দরবনের অন্যতম প্রত্যন্ত এলাকা। ঘন জঙ্গলের শুরু হওয়ার আগে এটাই শেষ জনবসতি। এছাড়া এই ছোটো মোল্লাখালির সীমান্তে রয়েছে মরিচঝাঁপি, যা ১৯৭৯ সালের কুখ্যাত গণ উচ্ছেদের জন্য আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

কালীদাসপুর একটি ছোট্ট গ্রাম। এই গ্রামে প্রায় ৬৭৯ হেক্টর মতো কৃষিজমি রয়েছে। গ্রামে হাজার পাঁচেক মানুষ বসবাস করেন। ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী, গ্রামে ১,৩৪৩টি বাড়ি রয়েছে। এছাড়া এই গ্রামে রয়েছে একটি পোস্ট অফিস, একটি মাত্র স্কুল- যার নাম কালীদাসপুর বিসিজে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল।

স্কুলের রেকর্ড অনুযায়ী, প্রায় ১০০০ পড়ুয়া এখানে পড়াশুনা করে। গোটা গ্রামে মূলত মাটির দেওয়ালের বাড়ি আর কিছু পাকা বাড়ি রয়েছে। এরই মাঝে তিন তলার স্কুল গ্রামের একটি অন্যতম বড় বিল্ডিং হয়ে উঠেছে। তাই যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়, তখন গ্রামের মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে এই স্কুল বিল্ডিং।

গ্রামের চারিদিকে ধান ক্ষেত। গ্রামের প্রায় সবাই কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। এটাই তাদের রোজগারের অন্যতম উপায়।

বাঁধের সমস্যা

নদীবাঁধ সুন্দরবনের অন্যতম বড় সমস্যা। প্রায় প্রতি বছরই সুন্দরবনের নদীবাঁধগুলিতে ভাঙন দেখা দেয়। সুপার সাইক্লোন আয়লা বা আম্ফানের আঘাতে সেগুলির অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। গ্রামের বছর ৩৩-এর বাসিন্দা অনুপ মণ্ডল বলেন, মে মাসের শুরুর দিকে আমরা বীজ তলা তৈরি করেছিলাম। এটি বেড়ে উঠতে মোটামুটি মাস দুয়েক সময় লাগে। আমরা নভেম্বরের মাঝামাঝিও বীজ রোপণ করি।

অর্থাৎ এই বছর বীজ রোপণের পরই আম্ফান আছড়ে পড়েছিল সুন্দরবনে।

গ্রামে অনুপের দুই বিঘা জমি রয়েছে। বীজ তলা সহ অন্যান্য কাজে তার প্রায় ১০,০০০ টাকা খরচা হয়। সেই ফসল তিনি স্থানীয় বাজারে ১৬,০০০ টাকায় বিক্রি করেন। অর্থাৎ তার লাভ ৬০০০ টাকা। এই টাকা তার বছরের অন্যতম মূল রোজগার।

অনুপের স্ত্রী সুপ্রিয়া একটি এনজিওতে কাজ করেন। সেখানে তিনি সাড়ি, মাস্কের মতো জিনিস তৈরি করেন, যা থেকে মাসে রোজগার হয় ৫,০০০ টাকা। বিদ্যাধরী নদীর বাঁধের পাশে দু কামরার মাটির বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকেন অনুপ। তাদের কন্যা সন্তান রয়েছে।

অনুপের কাছে ২০২০ সালটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। নদীর গ্রাস থেকে ধান জমি রক্ষা করতে যে বাঁধা দেওয়া হয়েছিল, আম্ফানে তা ভেঙে গ্রামে জল ঢুকে পড়ে। নদীবাঁধ ভেঙে যখনই জল ঢোকে, তাতে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি জমির উর্বরতা কমে যায়, কারণ সুন্দরবনের নদীগুলির জল অত্যন্ত লবণাক্ত। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত দ্য ইন্ডিয়ান এগরিকালচার রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রফেসর এনপিএস যদুবংশী বলেন, মাটিতে লবণাক্ত উপাদানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে ধান গাছের বৃদ্ধি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। মাটিতে অত্যাধিক পরিমাণ লবণ থাকলে ধান গাছের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ধান জমির ক্ষতির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় অনুপের গলা বুজে আসছিল। তিনি বলেন, সাইক্লোনের দেড়মাস পর আমরা নদীবাঁধ নতুন করে নির্মাণ করার আগে পর্যন্ত জমিতে নোনা জল ঢুকেছে।

সুন্দরবনের নদীবাঁধগুলির অধিকাংশ প্রায় ১০০ বছরেরও আগে, ব্রিটিশ আমলে প্রথম তৈরি করা হয়। সাইক্লোন আয়লার তাণ্ডবে সুন্দরবনের ৭৭৮ কিলোমিটার নদীবাঁধ ভেঙে যায়। পরে সরকারী উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা হয়। সিমেন্ট, ইঁট এবং পলিপ্রপিলেন শিট দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যাতে এটি মজবুত হয়।

তবে এই সরকারী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের সুফল এখনও কালীদাসপুরে পৌঁছায়নি। অনুপ বলেন, আমাদের গ্রামে বাঁধ পুনরায় নির্মাণ করার কাজের দেখাশোনা করতে কোনো সরকারী আধিকারিক আসেননি। যখনই সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের গ্রামের নদীবাঁধ ভেঙে গিয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তখন গ্রামবাসীদের উদ্যোগেই বাঁধ পুননির্মাণ করা হয়েছে।

ধান জমিতে ঢুকেছে নোনা জল। কালীদাসপুর গ্রামের ছবি।

সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সেচ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ৫,০৩২ কোটি টাকার তহবিলের মাত্র ২০ শতাংশ খরচ হয়েছে, নির্মাণ হয়েছে ১০০ কিলোমিটার মতো নদীবাঁধ। সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সরকারী আধিকারিক এর চেয়ে আর বেশি কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, নদীবাঁধ মেরামত, বিশেষত যখন দ্রুত মেরামতের প্রয়োজন হয়, তখন গ্রামবাসীদেরকেই হাত লাগাতে হয়।

অনুপবাবু বলেন, এই নদীবাঁধগুলি পুনরায় নির্মাণ করার জন্য আমরা ছোটো মোল্লাখালি গ্রাম পঞ্চায়েতে বারবার অনুরোধ পাঠিয়েছি। কিন্তু তার কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। নদীবাঁধ ভেঙে জমিতে নোনা জল ঢুকে যাওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই এই বছর প্রত্যাশা অনুযায়ী তার জমিতে ফসল ফলবে না। পরিবারের সবার মুখে দুবেলা দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়াটাই আপাতত অনুপবাবুর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ।

ঝড় আমার জমি এবং আশা কেড়ে নিয়েছে

কালীদাসপুরের বাসিন্দারা বলেন, তাদের এবং সাইক্লোনের মাঝে একমাত্র ঢাল হল এই নদীবাঁধ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের পরিমাণ কমে যাওয়াতেই সাইক্লোনে নদীবাঁধ আগের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ জয়ন্ত সেন বলেন, ম্যানগ্রোভের শিকড় মাটি শক্ত করে ধরে রাখে। সাইক্লোন যখন আছড়ে পড়ে, তখন সহজে মাটির ক্ষয় হয় না। তবে এখন ম্যানগ্রোভের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন, অরণ্য নিধনের মতো কারণে সুন্দরবনের মাটি অনেক বেশি আলগা হয়ে পড়েছে। (২০১৯ সালের) নভেম্বরের আয়লা এবং (২০২০ সালের) মে মাসের আম্ফান, মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে এই দুটি বিশাল ঝড় সুন্দরমের মৃত্তিকার ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

সুন্দরবনের বাসিন্দারা বলেন, গত বছরের নভেম্বরে সাইক্লোন বুলবুল আছড়ে পড়ার সময় অনেক গাছ ধ্বংস হয়েছিল। কালীদাসপুরের বাসিন্দা, কৃষক সৌমিত্র মণ্ডল বলেন, আমাদের গ্রামে শয়ে শয়ে ম্যানগ্রোভ রয়েছে। তবে বুলবুলের তাণ্ডবে প্রায় ৯০ শতাংশ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

বছর ২৭-এর সৌমিত্র মে মাসের আম্ফানে তার দেড় বিঘা জমির ফসল হারিয়েছেন। তার বাবা সনাতন গত নভেম্বরে মারা গিয়েছেন। বাড়ির বড় ছেলে হওয়ায় এখন সংসারের সমস্ত দায়িত্ব তার উপর, বিশেষত কৃষিকাজ তাকেই সামলাতে হয়।

সৌমিত্র বলেন, এই বছর প্রথমবার নিজের থেকেই সমস্ত কাজ করেছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার কাজ দেখে আমার বাব গর্বিত হবেন। তবে সাইক্লোন শুধু আমার জমির ফসল নয়, তার সাথে আমার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিয়েছে।

সৌমিত্রকে তিন ভাই এবং একটি বোন রয়েছে। তাকেই সবার দেখভাল করতে হয়। আপাতত রোজগারের তেমন কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। তাই অথৈ জলে পড়েছেন সৌমিত্র। তিনি বুঝতে পারছেন না কীভাবে সংসার চালাবেন। কালীদাসপুরের প্রায় প্রতিটি গ্রামে এরকম একটা না একটা ট্র্যাজেডির গল্প রয়েছে। সজনেখালিতে টাইগার রিজার্ভে বনদপ্তরের অফিসে পিওন হিসাবে ৩০ বছর কাজ করেছেন অনুকূল মণ্ডল (৭৫)। অবসরের পর তিনি কালীদাসপুর গ্রামে দু-কামরার পাকা বাড়িতে স্ত্রী কমলা, তাদের দুই সন্তান, পুত্রবধু এবং এক নাতনিকে নিয়ে বাস করছিলেন। ২০০৯ সালে আয়লায় তাদের বাড়ি ভেঙে পড়ে। মারা যান অনুকূলের পুত্র, তাদের স্ত্রী এবং নাতনী। অনুকূল এবং তার স্ত্রী কোনোমতে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভেঙে পড়া বাড়ি পুনরায় নির্মাণ করার জন্য নিজের জমানো টাকার একটা বড় অংশ অনুকূলকে খরচ করতে হয়েছে।

স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে গতবছর মৃত্যু হয় কমলার। এখন একাই বাড়িতে থাকেন অনুকূলবাবু। তিনি বলেন, আমার পরিবারের কোনো সদস্য আর নেই। এখন কেবলমাত্র তাদের স্মৃতি রয়েছে। রান্না ঘরে ট্রাঙ্কের মধ্যে যত্নে আমি পরিবারের সবার ছবি রেখেছি। যখনই তাদের দেখার ইচ্ছা হয়, তখন ট্রাঙ্ক থেকে সেই ছবি বের করে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকি।

তবে এই বছরের আম্ফানের পর সেটাও আর করতে পারেন না অনুকূলবাবু। কারণ সাইক্লোনে তার বাড়ির একটা দিক ভেঙে গিয়েছে আর তাতে ছবি থাকা ট্রাঙ্কটিই জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছে। আবেগতাড়িত, কাঁপাকাঁপা গলায় অনুকূল বলেন, ১০,০০০ টাকার মাসিক পেনশনের সৌজন্যে আমি ফের বাড়ি নির্মাণ করেছি। তবে আমার সব স্মৃতি আবার কে তৈরি করবে? আমার মনে হচ্ছে, ফের আমার পরিবার হারালাম।

খরচ অনেক তবে কোনো রোজগার নেই

অনুপের মতো একই অবস্থা কালীদাসপুর গ্রামের বাসিন্দা রমারাণী বৈদ্যর (৪৬)। আম্ফানের সময় তার দেড় বিঘা ধান জমি নোনা জলের তলায় চলে যায়। তিনি বলেন, সাধারণত প্রতি বছর আমি ১০-১২ বস্তা ধান উৎপাদন করি। তবে এবছর মরসুমের শুরুর দিকেই বন্যা দেখা দিল।

আম্ফানের মাস দেড়েক পর নদীবাঁধ নির্মাণ হওয়ার পর তার জমি থেকে নোনা জল বের করা সম্ভব হয়েছিল। তবে তাতেও যে ছবিটা খুব একটা বদলেছে, এমনও নয়। রমারাণী বলেন, সব শেষ হয়ে গিয়েছে। এবার আমি সাধারণ উৎপাদনের দশভাগের একভাগের বেশি আশা করছি না।

কারণটা স্পষ্ট, নোনা জলে জমির উর্বরতা কমে যাওয়া। রমারাণীর স্বামী সতীশ বৈদ্য প্যাংক্রিয়াটিক অসুস্থতায় বিগত তিনবছর ধরে শয্যাশায়ী। তাই সংসার চালানোর দায়িত্ব এখন রমারাণীর কাঁধে। স্বামীর ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচের টাকা তাকেই জোগাড় করতে হয়। তাদের কোনো সন্তান নেই।

রমারাণী জানান, ধান চাষ করে বছরে তিনি ১০,০০০ টাকা মতো রোজগার করেন। এছাড়া নিজের জমির সব্জি বিক্রি করে মাসে ১,০০০ টাকা মতো রোজগার হয়। একটি এনজিওর হয়ে হাতে বোনা জিনিস বিক্রি করে মাসে তিনি ২,০০০-৩,০০০ টাকা রোজগার করেন। অন্যদিকে সতীশের চিকিৎসার বিপুল খরচ। কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া এবং ওষুধ সহ মাসে খরচ হয় প্রায় ৪,০০০ টাকা। রমারাণী বলেন, স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগানো দিনকে দিন আমার কাছে আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এখন রোজগার প্রায় না থাকায় কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

সাইক্লোন কেবলমাত্র ধান জমি ক্ষতি করেই ক্ষান্ত থাকেনি। সুন্দরবনের কালীদাসপুর গ্রামে হরেকরকমের সব্জি ফলে, যেমন বেগুন, ঢেঁড়স এবং আলু। সুন্দরবনের স্থানীয় বাজার সহ ৫৪টি দ্বীপের বিভিন্ন বাজারেও যায় এই সব্জি। প্রতি সপ্তাহে নৌকার মাধ্যমে নির্দিষ্ট জায়গায় এইসব সব্জি পৌঁছে দেওয়া হয়। সব্জি বিক্রি করে সৌমিত্র এবং রমারাণীর মতো গ্রামবাসীরা মাসে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা রোজগার করেন। যখন তাদের ফসলের উৎপাদন বাড়ে, তখন এই রোজগার ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা হয়। অনুপ বলেন, বন্যার কারণে আমাদের সমস্ত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এই বছর সব্জি থেকে আমাদের রোজগার একদম নেই। ২০১০ সালে সাইক্লোন আয়লার পরও একই জিনিস ঘটেছিল। রমারাণী বলেন, মাটির উর্বরতা এতটাই কমে গিয়েছিল যে পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রত্যাশিত ফলন ফলেনি। আম্ফানের পরও তিনি একই আশঙ্কা করছেন। অর্থাৎ তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী, নতুন করে শক্তিশালী সাইক্লোন না দেখা দিলে ২০২৩ সাল নাগাদ তাদের জমির উৎপাদনের পরিমাণ আগের মতো হতে পারে। তবে অনুপবাবুর মতে, জমির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা ফিরে আসতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। তিনি বলেন, আয়লায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল এবং এই ঝটকা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের অনেক সময় লেগেছিল। আম্ফান কিন্তু আয়লার চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল। তাই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমার মনে হয় না (কৃষিক্ষেত্রে) পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

সরকারি সাহায্য

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সরকারী ভূমিকা কতটা সক্রিয় ছিল?

আম্ফানের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষকদের জন্য ত্রাণ ঘোষণা করেছিলেন। তবে কালীদাসপুরের বাসিন্দাদের দাবি, তাদের কাছ ত্রাণ পৌঁছায়নি। তারা প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও তারা ত্রাণের টাকা পাননি বলে অভিযোগ তুলেছেন। বিরোধীদের দাবি, ত্রাণ তহবিলের টাকা নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। যদিও সরকার সেসব মানতে নারাজ। এদিকে একটি বিষয় নিশ্চিত, সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের জীবনে খুব একটা সুরাহা হয়নি। এক্ষেত্রে বাড়ি ছেড়ে, নিজের গ্রাম ছেড়ে শহরে শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়াটাই তাদের কাছে এক অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে। যেমন অনুপ বলেন, নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে কাজ করার জন্য আমি কলকাতায় যেতে পারি। আয়লার পর আমি তাই করেছিলাম। সৌমিত্র বলেন, সাইক্লোন আয়লার পর তিনি কলকাতায় শ্রমিক হিসাবে তিন বছর কাজ করেছেন। দিনে তার ২০০-৩০০ টাকা রোজগার হত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে আর কোনো উপায় নেই। আমাদের গ্রামটা পুরো মরুভূমি হয়ে গেছে।

তথ্য ও ছবি ঋণ: www.newslaundry.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

স্যামসনের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং, তবুও শেষ হাসি হাসল পাঞ্জাব

স্কোরবোর্ড বলছে, আইপিএল ২০২১-এর চতুর্থ ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ রানে হারিয়ে দিয়েছে পাঞ্জাব কিংস। তবে সেটা দেখে ম্যাচের আসল ছবি বোঝা যাবে...

ধর্নায় বসবেন মমতা

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রচারের উপর 24 ঘন্টার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই...

মানুষ মরে এভাবেই, কেউ খোঁজ রাখে না

বিশ্বজিৎ মান্না ধরুন আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে, বাজারের থলে হাতে নিয়ে বেরোলেন। আপনার বাড়ির লোক বা আপনি কী...

ফের ক্ষমতায় দিদি, তবে বিজেপির আসন বাড়বে: বলছে সমীক্ষা

বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম বিরোধী দল হিসাবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেন্দ্রের শাসক দলের দাবি, রাজ্যে এবার তারাই ক্ষমতায় আসতে চলেছে।...

Recent Comments

error: Content is protected !!