বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৬, ২০২০
Home District বিদেশের বাজারে কোটি টাকায় বিক্রি হওয়া সুন্দরবনের চিংড়ি যারা ধরেন, তাদের কথা...

বিদেশের বাজারে কোটি টাকায় বিক্রি হওয়া সুন্দরবনের চিংড়ি যারা ধরেন, তাদের কথা কেউ মনে রাখে না

১,৪৬৭ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

পরের বার কোনো ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁয় বসে গলদা চিংড়ির সুস্বাদু পদ খাওয়ার আগে আশারাণী মণ্ডল এবং তার ১৪ বছর বয়সী কন্যার কথা পারলে একটু ভাববেন। এরাই হল সুন্দরবনের প্রায় দুই লক্ষ স্বীকৃতিহীন মহিলা যারা সুন্দরবন থেকে গলদা চিংড়ি ধরেন, যেগুলি শহরের বিলাসবহুল রেস্তারাঁগুলিতে চড়া দামে বিক্রি হয়।

এদের জীবনযাত্রা যেকোনো ব্লকবাস্টার ছবির চিত্রনাট্যকে হার মানাতে পারে। আশারাণী কাকভোরে উঠেই কোমর সমান নোন জলে নামেন। তার এক কাঁধে থাকে জাল। পিছনে থাকে তার কিশোরী মেয়ে। সে সাঁতার কাটতে কাটতে মায়ের পিছনে এগোতে থাকে। তার কাজ হল জালটা টেনে ধরা, যাতে তাতে মীন, অর্থাৎ গলদা চিংড়ির ছানাদের ঢুকতে কোনো অসুবিধা না হয়। ৩০ বছর বয়সী আশারাণী তার পরিবারের একমাত্র রোজগেরে। তার স্বামী থাকলেও তিনি শারীরিক অক্ষমতায় ভুগছেন। স্বামী ছাড়াও তার দুই সন্তান রয়েছে। সংসারে সবার মুখে দুবেলা দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে গত সাত বছর ধরে মীন ধরছেন আশারাণী।

প্রত্যেকবার তারা যখন কাজ করতে বেরোয়, আক্ষরিক অর্থে ওপরওয়ালা ছাড়া তাদের আর ভরসা করার মতো কেউ নেই। সুন্দরবনের লবণাক্ত নদীতে থাকা হিংস্র কুমীর এবং খাঁড়ি লাগোয়া জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বাঘের আক্রমণের আশঙ্কা নিয়েই তাদের কাজ শুরু করতে হয়। বিপদ আছে জেনেও তাদের নদীতে নামতে হয়। নদীতে না নামলে খাবে কি। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের লবণাক্ত নদীতে বার বার নামার ফলে তাদের স্কিন ক্যানসার, ভ্যাজাইনাল ইনফেকশন এবং হাড় ও হাঁটুর নানা সমস্যায় ভোগারও আশঙ্কা থাকে। তবুও সুন্দরবনের এই মহিলাদের প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘন্টা ধরে নদীর জলে পড়ে থাকতে হয়।

আশারাণীর প্রতিবেশী প্রতিভা দাস (২৫), ভদ্রশী মণ্ডল (৬২) এবং চম্পা মণ্ডল (১৯)-এর মতো অনেকেই মীন ধরার কাজে যুক্ত। কেউ কেউ এই পেশায় বিগত ৪০ বছর ধরে রয়েছেন। তাদের দিনে রোজগার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। নদীর কোন প্রান্তে ভালো মীন পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে আগাম অনুমানের জন্য তারা বহু পুরানো পন্থা, আবহাওয়ার অবস্থা, জোয়ারের প্রকৃতি  এবং জলের স্রোত দেখেন। আশারাণী বলেন, আমরা সর্বদা ভাটার জন্য প্রার্থনা করি কারণ এই সময়েই আমরা অধিক পরিমাণ মীন সংগ্রহ করতে পারি। বিশেষত পূর্ণিমা এবং অমাবস্যার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। এই সময়েই আমরা সবচেয়ে বেশি মীন ধরতে পারি।

এই মহিলারা নিজেদের হালকা জাল তৈরি করেন। প্রতিভা বলেন, এটি তৈরি করতে সাধারণ প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা খরচ হয়। আমরা হালকা জাল তৈরি করি কারণ মীন ধরার প্রক্রিয়া বেশ পরিশ্রম সাপেক্ষ ব্যাপার। কখনও কখনও আমরা ডিনার করার জন্য বাইরে যাই।

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একাধিক সমস্যা, অথচ আশেপাশে হাসপাতাল নেই

ছোট্ট ডিঙির উপর বসে থেকে আশারাণী তার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলতে থাকেন। নোনা জল এবং কাদার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে তাদের এই সমস্যায় পড়তে হয়। তিনি বলেন, আমার সারা গায়ে সর্বক্ষণ একটা জ্বালা হয়। এছাড়া আমার বেশ কিছু গাইনোকলোজিক্যাল সমস্যা রয়েছে।

সুন্দরবনের ৪৫টি ব্লকের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মহিলারা এই মীন ধরার সঙ্গে যুক্ত। বাসন্তী গ্রাম থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে একটিমাত্র সাব-ডিভিশনাল হাসপাতাল। এখানেই আশারাণী সহ অন্যরা বসবাস করেন। চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালই তাদের একমাত্র ভরসা। আশারাণীর আক্ষেপ, থেকে থেকে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। বমি বমি ভাব আসেছ। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অসাড় হয়ে যায়। আমাকে রান্নাও করতে হয়। আমার অসুস্থ স্বামীর দেখভাল করতে হয়। দুই সন্তানকে প্রাইমারি স্কুলে পাঠাতে হয়। এই সব কিছুর প্রভাব পড়ে আমার শরীরে। এই ছোট্ট হাসপাতালের সামনে শয়ে শয়ে মানুষ চিকিৎসার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়ান। তবুও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এখানে যথাযথ সরঞ্জাম নেই। স্বাস্থ্যকর্মীরা সাধারণত আমাকে পেইনকিলার দেন। কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। আমাদের রোগের চিকিৎসা করার জন্য ওদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। মহিলা এবং শিশুদের সর্বদা এর জন্য ভুগতে হয়।

মীনের দামে পতন

একসময় মীন ধরা একটি লাভজনক পেশা হয়ে উঠেছিল। মাত্র কয়েক বছর আগেও এক হাজার মীনের দাম ছিল ৬০০ টাকা। তবে হঠাৎ করে এর দাম কমে হয় মাত্র ২০০ টাকা। পেশার আর কোনো বিকল্প না থাকায় মীন ধরাকেই আঁকড়ে ধরেছেন সুন্দরবনের মহিলারা। দাম কমলেও এই পেশা থেকে তাদের সরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ভদ্রশী মণ্ডল বলেন, এই কাজের সঙ্গে আমি ৪০ বছর ধরে যুক্ত রয়েছি। মাছ ধরার সময় কুমীরের আক্রমণে পরিবারের সদস্যরা মারা যাওয়ার পর মহিলাদের কি সংগ্রাম করতে হয়, তাদের কি অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। সরকার বা অন্য কেউই আমাদের কথা ভাবে না। সবাই কেবল আমাদের জন্য করুণা প্রকাশ করেন।

সুন্দরবনের মৎসজীবী পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা প্রদানের কাজে যুক্ত একটি এনজিওর তরফে বিকর্ণ নস্কর বলেন, সুন্দরবনের মৎসজীবী সম্প্রদায় চরম দারিদ্রের মধ্যে রয়েছেন। মাছ ধরা তাদের কাছে একমাত্র জীবীকা হয়ে উঠেছে। তবে খাঁড়ি অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাছ ধরা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটা ব্যাপার। বিশেষত মহিলা মৎসজীবীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। মমতা ব্যানার্জী কন্যাশিশুদের জীবনে দাঁড় করাতে কন্যাশ্রী এবং রুপশ্রীর কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এগুলি কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। আমাদের এনজিও মহিলাদের সমস্যাগুলি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। কিন্তু তাতে কোনো ফল মেলেনি। গ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি চালায় হাতুড়েরা যাদের রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই। সরকারের পদক্ষেপ কেবলমাত্র বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছে।

সজনেখালি এবং সন্দেশখালি ব্লক থেকে ৬০টি মহিলা নিয়ন্ত্রিত বিষয় এবং মীন ধরা পেশায় থাকা সুন্দরবনের ৬০ জন মহিলাকে বেছে নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছিল। এর নাম ছিল দ্য অ্যাসেসমেন্ট অব ইরগোনোমিক অ্যান্ড অকুপেশনাল হেলথ রিলেটেড প্রবলেমস। এই গবেষণায় মহিলাদের মাস্কালোস্কেলিটাল ডিসঅর্ডার এবং ফিজিওলজিক্যাল স্ট্রেসের তুলনা এবং মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সেখানে দেখা গিয়েছে যে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী (৯৮ শতাংশ) পিঠের সমস্যা, হাঁটুর সমস্যা (৮৮ শতাংশ, কাঁধের সমস্যা (৭৫ শতাংশ), গোড়ালির সমস্যা (৭০ শতাংশ) এবং পায়ের সমস্যায় (৬৭ শতাংশ) ভুগছেন। এছাড়া ২০১৩ সালে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কলেরা অ্যান্ড এন্ট্রেটিক ডিজিজেস এবং আন্তর্জাতিক এনজিও সেভ দ্য চিলড্রেন কর্তৃক পাথরপ্রতিমা ব্লকে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে সুন্দরবনের ৬৪ শতাংশ মহিলা রক্তাল্পতায় ভুগছেন।

ফোড়েদের রাজত্ব

পরিহাসের বিষয় হল গলদা বা বাগদা চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল দাম থাকলেও এগুলি যারা ধরেন, সেই সুন্দরবনের মৎসজীবীরা এখনও চূড়ান্ত দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মূলত বড় সাইজের গলদা চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি করা হয়, যা থেকে পশ্চিমবঙ্গের বছরে আয় হয় ১,৫০০ কোটি টাকা। সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রন হ্যাচারি আছে। তবে ফোড়েদের দাপটে এই বিপুল দামের ন্যায্য ভাগ মৎসজীবীদের পকেটে পৌঁছাতে পারে না।

মহিলারা নদী থেকে যে মীন ধরেন, সেগুলি চার মাসের জন্য চাষ করা হয়। এই সময় এগুলি পূর্ণবয়স্ক রূপ নেয়। ক্যানিং, বারাসত এবং ধামাখালির হোলসেল মার্কেটে এগুলি বিক্রি হয়। মীন ধরার পর টাইগার প্রনের থেকে অন্যন্য মাছের চারাকে পৃথক করা হয়। অবশিষ্ট চারা মাছকে ফেলে দেওয়া হয়। সমুদ্রের থেকে আসা টাইগার প্রন ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড়ে এবং বাঁধের ধারে ডিম পাড়ে। যখন ডিম ফুটে যায়, ক্ষুদ্র দেখতে মীনকে টানাা জালে ধরা হয়। পরে সেগুলিকে হ্যাচারিতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাজারে এই পূর্ণবয়স্ক টাইগার প্রনের দাম ওঠে কেজি প্রতি ১০০০ টাকা পর্যন্ত।

নস্করের সঙ্গে সামাজিক কাজে যুক্ত দেবব্রত মণ্ডল বলেন, এই মহিলারা যে সমস্ত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগেন সেই ব্যাপারে সরকারের তরফ বিশদে খতিয়ে দেখা হয়নি। এই বিষয়ে পরিবেশবিদরাও উদবেগ প্রকাশ করেছেন। পরিবেশবিদ এবং সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ শান্তনু চক্রবর্তী বলেন, আপনি বিশ্বের আর কোথাও দেখতে পাবেন না একটি কমিউনিটি এত দারিদ্রের মধ্যে রয়েছে এবং মহিলা মৎসজীবীরা এরকম ভুগছেন।

স্থানীয় মৎসজীবীদের সংগঠনের প্রধান মলয় দাস এবং তার সংগঠন সরকারের কাছে এই বিষয়টি উত্থাপন করলেও এই ব্যাপারে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

সুন্দরবনের নানা সমস্যার সমাধানের জন্য একটি পৃথক দপ্তর তৈরি করা হয়েছে। এই দপ্তরের দায়িত্বে একটি আলাদা মন্ত্রীও রয়েছেন। তবুও সুন্দরবনের মহিলা মৎসজীবীদের জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। তাদের থেকে সুন্দরবনের বাঘ অনেক বেশি প্রচারের আলো পায়।

তথ্যসূত্র- ২০১৮ সালের ১০ আগস্ট দ্য ফার্স্টপোস্ট ডট কমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন

ছবি ঋণ – দ্য হিন্দু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

সাইক্লোন নিভার লাইভ আপডেট: জলমগ্ন চেন্নাইয়ের বহু এলাকা

বুধবার গভীর রাতে বা বৃহস্পতিবার ভোরে তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরির মাঝে আছড়ে পড়তে পারে শক্তিশালী সাইক্লোন নিভার। এমনটাই জানিয়েছে ইন্ডিয়ান মেটেরলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট।

২০২১-এর শুরুতেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সিরিজ খেলবে ভারত

করোনা মহামারির জেরে ২০২০ সালের অধিকাংশ সময়ে কোনো ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে...

আরও ৪৩টি চাইনিজ অ্যাপ ব্লক করল ভারত

মঙ্গলবার মিনিস্ট্রি অব ইলেক্ট্রনিক অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনলজি (Meity) ভারতে আরও ৪৩টি চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই অ্যাপগুলির মধ্যে রয়েছে আলিবাবা ওয়ার্কবেঞ্চ,...

সাইক্লোন নিভার লাইভ আপডেট: চূড়ান্ত সতর্কতা, প্রস্তুত উদ্ধারকারী দল

ফের এক সাইক্লোনের আশঙ্কায় ত্রস্ত দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশ। এই সাইক্লোনের নাম নিভার। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ...

Recent Comments

error: Content is protected !!