বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৯, ২০২১
Home feature বার্ষিক দুর্যোগ ও ঘর পোড়া গরু

বার্ষিক দুর্যোগ ও ঘর পোড়া গরু

২৯৯ Views

লিখছেন তুষারকান্তি বিশ্বাস
বার্ষিক দুর্গোৎসবের মতই বার্ষিক দুর্যোগ। তবে একে উৎসব বলা অত্যন্ত হীন, নীচ মানসিকতা। বার্ষিক দুর্যোগকে কোন অবস্থাতেই উৎসব বলা চলে না। যদিও কোন এক জায়গায় তারও একটা ব্যতিক্রম আছে। ওই যে বাংলায় একটা কথা আছে, কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ- এক্ষেত্রেও সেটা বলা চলে। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। ব্যাপারটা কেমন? সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাংশ প্রায় প্রতি বছরই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে। তছনছ হয়ে যায় জনজীবন। প্রবল ঝড় তার সঙ্গে প্রবল বর্ষণ, প্রকৃতি যেন প্রতিবছরই এখানে তার রুদ্ররূপ দেখিয়ে মানুষের অপকর্মের বদলা হিসেবে ধ্বংসলীলা চালিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: রাজার কান্না
পূর্ব মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা এভাবেই দিনযাপন করতে কার্যত বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিবছর কখনো একটা কিংবা কখনো একাধিকবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছড়ে পড়ে এসব অঞ্চলে। কখনো কখনো এখানকার মানুষ একটা ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে না সামলাতেই পরের ঝড়ের মুখে পড়েন। স্থাবর অস্থাবর, সব সম্পত্তি খুইয়ে তাঁরা কীভাবে যে বেঁচে থাকেন সেটাই এক আশ্চর্যের বিষয়। এবারের দুর্যোগ ইয়াস সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে। আমফানের পর ঠিক এক বছর কাটতে না কাটতেই আবার এসে হাজির ইয়াস। তবে আমফান যেমন গত বছর দক্ষিণবঙ্গের বিশাল অঞ্চলকে সরাসরি আঘাত করেছিল এবার ইয়াস কিন্তু ঠিক ততটা আঘাত করতে পারেনি। ফলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধ অঞ্চলেই ক্ষতিটা হয়েছে মারাত্মক। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ২৫টি ব্লকের প্রায় নয় লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার ঘরবাড়ি এবং প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৭২ টি নদীবাঁধ।
আরও পড়ুন: ঠিক কী ঘটেছিল উহানে?
অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ছয়টি ব্লকের প্রচুর গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভয়ঙ্করভাবে। এসব একেবারেই প্রাথমিক হিসাব। যত সময় যাচ্ছে নতুন নতুন জায়গা থেকে হিসাবের পরিসংখ্যান আসছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। আমরা সাধারণ মানুষ। আমাদের কাছে ক্ষয়ক্ষতির এইসব কাগুজে হিসাব বাহ্যিক যন্ত্রণাই বাড়ায়। আসল যন্ত্রণার জায়গা সেই সব ভুক্তভোগীদের পাশে যারা দাঁড়াতে পারি না কিংবা দাঁড়াতে পারিনি, তাদের কষ্ট বোঝা সম্ভব নয়। সে কষ্ট পান অধিকাংশ মানুষ। তাদের সেই অনুভূতিটা আছে। আবার এই ছবির একটা উল্টো পিঠও আছে। কিছু মানুষ তারা এহেন দুর্যোগে খুশি হয়। ওই যে বলেছিলাম না কারো সর্বনাশ, কারো পৌষ মাস। যেসব মানুষ দুর্যোগে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর নাম করে কিংবা বলা ভালো, অভিনয় করে নিজেদের আখের গুছিয়ে পৌষ মাস ডেকে আনেন এইসব বদমায়েশরা। অবশ্যই এদের মধ্যে একটা বড় অংশ রাজনীতিক এবং ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আমফান দুইভাবে সামাজিক জীবনকে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনের এই সমুদ্র সৈকত গোয়াকেও হার মানাতে পারে
প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের দৈনিক দিনযাপনকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয়তঃ, এই দুর্যোগকে ঘিরে যে বিরাট দুর্নীতির চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তার সামান্য কিছু অংশ প্রকাশ্যে এনে ফেলে। প্রমাণিত হয়েছিল দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত যারা তাদের বেশিরভাগই রাজনীতিক। রাজ্যের শাসক দলের সদস্য। নিজের দলের সদস্যদের একাংশের সেই দুর্নীতি এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীও। আশা করা যাক সেইসব কলঙ্কের ইতিবৃত্ত তিনি বিস্মৃত হননি। প্রবল আলোচিত সেইসব কলঙ্কের পর একটা বিধানসভা নির্বাচন পার হয়ে গিয়েছে। ক্ষমতায় ফিরে এসেছে সেই শাসক দলই। যদিও এ রাজ্যের মানুষ নির্দিষ্ট কিছু কারণে সেইসব কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও তৎকালীন শাসকদলকেই আবার নির্বাচিত করে আগামী পাঁচ বছর সিংহাসনে বসার অনুমতি দিয়েছে, তারা অবশ্যই আশা করে আমফানের আর্থিক কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি ইয়াসের ক্ষেত্রে হবে না।
আরও পড়ুন: প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে যারা চিংড়ি ধরেন তাদের কথা কেউ মনে রাখে না
এবারেও প্রচুর ঘরবাড়ি ভেঙেছে, রাস্তাঘাট নষ্ট হয়েছে, নদীবাঁধ ধ্বংস হয়েছে, বিপুল সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই সময় ভেঙে যাওয়া নদীর বাঁধ, রাস্তাঘাট মেরামতি সহ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের কর্তব্য। আর এই কর্তব্যের জায়গা থেকেই শুরু হয় দুর্নীতি। সরকার দুর্নীতি করে এমন কথা বলা ঠিক নয়। কিন্তু শাসক দল কিংবা শাসক দলের নেতাদের একাংশ যে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এটা আমফানের পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করে দিয়েছে। নদীপ্রধান সুন্দরবন এলাকার বাঁধগুলি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করতে কতটা সক্ষম তার হিসাব নিকাশ হয়েছে বলে এখনো শোনা যায়নি। যদিও সেই কাজ সরকারেরই দায়িত্ব। সুন্দরবন এলাকার একাধিক নদী বাঁধ বস্তুত অত্যন্ত দুর্বল। বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে এখনও তারা দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণ মানুষের বুদ্ধি সেগুলো পোক্ত করে মেরামতির কথা ভাবলেও কিছু মানুষ তা ভাবে না। কারণ সেই মেরামতিই তাদের আয়ের প্রধান উৎস। বাঁধ যত ভাঙবে, মেরামতে ততো বাড়বে ততোই তাদের আয়ও বাড়বে– এটাই তাদের দর্শন। এই দর্শনের কথা সবাই জানেন, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীও। তাই এবারে নদী বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রকাশ্যে তিনি উষ্মা দেখিয়েছেন। জানতে চেয়েছেন বাঁধগুলি পাকাপোক্তভাবে মেরামত কেন হয় না। মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু জানেন বাঁধগুলি পাকাপোক্তভাবে মেরামতি করা হলে বহু মানুষের আয় কমবে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির টাকা ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছলেও বহু মানুষের আয় কমবে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমবে তাদের সমর্থন। কারণ প্রতি বার একটি সাম্প্রদায়িক দলের জুজু দেখিয়ে ভোটের বাক্স ভরানো যাবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

কুমীরের আক্রমণে আহত রাক্ষসখালীর যুবক

কুমীরের আক্রমণে গুরুতর আহত রাক্ষসখালীর এক যুবক। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ নদীতে মাছ ধরার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত যুবকের নাম...

আফগানিস্তানে খতম ২৬২ তালিবান, দেশজুড়ে কার্ফিউ

গত ২৪ ঘন্টায় আফগানিস্তানে মোট ২৬২ জন তালিবান জঙ্গিকে খতম করা হয়েছে। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই খবর জানিয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে, আফগান...

শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টি-২০ সিরিজে ডেবিউ করতে পারেন বরুণ চক্রবর্তী

আপাতত ইংল্যান্ড সফরে রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট দল। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা সহ টিম ইন্ডিয়ার সিনিয়র খেলোয়াড়রা সেই স্কোয়াডে রয়েছেন। তাই শ্রীলঙ্কা সফরে...

কমছে কোভিড, সোমবার থেকে দিল্লিতে ১০০ শতাংশ ক্যাপাসিটি নিয়ে চলবে মেট্রো

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। খুলে যাচ্ছে দোকানপাট, সিনেমা হল। শনিবার দিল্লি সরকারের একটি অর্ডার থেকে জানা গিয়েছে, এবার দেশের রাজধানীতে...

Recent Comments

error: Content is protected !!