বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০
Home feature সঙ্কটে সুন্দরী: জলে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লোরোফিলে ব্যাহত হচ্ছে সালোকসংশ্লেষ

সঙ্কটে সুন্দরী: জলে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লোরোফিলে ব্যাহত হচ্ছে সালোকসংশ্লেষ

৩১৩ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

সুন্দরীর গল্প বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের মতোই রহস্যময়! ভারত-বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবস্থিত সুন্দরবন হল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আস্তানা।

উভয় বাংলার সুন্দরবন মূলত অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিচিত। দারিদ্র যেমন একদিকে রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে শোচনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। ন্যাশনাল পার্ক, সংরক্ষিত অরণ্যের মতো আকর্ষণীয় স্থান থাকা সত্ত্বেও সুন্দরবনের পর্যটন সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। মূলত অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকদের দেখা যায়। বর্ষা শুরুর সাথে সাথে সুন্দরবনে পর্যটন মরসুমের সমাপ্তি ঘটে। সুন্দরবনে যাতায়াতের মূল মাধ্যম হল নদীপথ।

সুন্দরবন মূলত যে দুটি বিষয়ের জন্য পরিচিত সেগুলি হল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এবং ম্যানগ্রোভ অরণ্য। রয়্যাল বেঙ্গল যে সঙ্কটের মুখে, তা অনেক আগেই আমরা জেনেছি। সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। খরচ করা হচ্ছে অনেক টাকা। সুন্দরবনে যাতে রয়্যাল বেঙ্গলের গর্জন না থামে, তার চেষ্টায় অন্তত কোনো ত্রুটি রাখা হচ্ছে না বলেই মনে হয়। আর এত কিছুর মাঝে সুন্দরবনের আর একটি উপাদান চরম অবহেলার মুখে পড়েছে- সেটি হল ম্যানগ্রোভ অরণ্য।

সুন্দরী শব্দের অর্থ হল যা দেখতে সুন্দর। অনেকে এটা বলেন যে এই সুন্দরী গাছের নাম থেকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের নাম দেওয়া হয়েছে। ভারত এবং বাংলাদেশের সুন্দরবনের প্রধান উদ্ভিদ হল ম্যানগ্রোভ, যার বৈজ্ঞানিক নাম হেরিটিয়েরা ফোমস।  সুন্দরী গাছ ৬০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একাধিক কারণে সুন্দরবনের এই আইকনিক গাছ আজ সঙ্কটের মুখে পড়েছে। সুন্দরী গাছের সঙ্কটে পড়ার মূল কারণ হল সুন্দরবনে অবৈজ্ঞানিক কৃষিকাজ। এছাড়াও রয়েছে জলে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, উপকূলবর্তী অঞ্চলে জঙ্গল কেটে জনবসতি স্থাপন এবং গাছের রোগ।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকা ট্রিবিউনের একটি রিপোর্টে প্রকাশ করা হয় যে, বিগত ৩০ বছরে বাংলাদেশে ২,০০০ কোটি টাকা মূল্যের ১.৪৪ মিলিয়ন কিউবিক মিটার সুন্দরী গাছ নষ্ট হয়েছে টপ ডায়িং ডিজিজের কারণে। সুন্দরবনে কাঠের অন্যতম যোগানদার হল সুন্দরী গাছ। এছাড়া সুন্দরী গাছে অনেক ঔষধি গুণও রয়েছে। যেমন ডায়াবেটিস, হেপটিক ডিসঅর্ডার, গ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ডিসঅর্ডার, গোইটার এবং ত্বকের নানা রোগের চিকিৎসায় সুন্দরী গাছের ব্যাপক ব্যবহার হয়। স্থানীয় মানুষ তো বটেই, চিরাচরিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় সুন্দরী গাছের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। একাধিক অনুসন্ধান থেকে জানা গিয়েছে যে সুন্দরী গাছে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিনোসিসেপ্টিভ, অ্যান্টিহাইপারগ্লিসেমিক, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি ক্যানসার অ্যাক্টিভিটিজ।

সুন্দরী গাছের কাঠ অত্যন্ত মূল্যবান। ফলে বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে এই গাছ ব্যাপক চোরাচালানের শিকার হয়েছে। সেই সাথে রয়েছে সমুদ্রের নোনা জলের স্তর বৃদ্ধির মতো চরম সমস্যা। আউটলুক ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার, আইএফএস সন্তোষ গুব্বি বলেন, সুন্দরবনে এবার সুন্দরী গাছ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। কারণ এই গাছ অত্যাধিক নোনা জল সহ্য করতে পারে না। আর বেশি উচ্চতাযুক্ত অধিক ভূমিভাগও নেই। উষ্ণায়ন কেবলমাত্র তাপমাত্রা বৃদ্ধিই নয়, সেই সাথে সমুদ্রের জলের লবণের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সুন্দরবনে সুন্দরী গাছ বেআইনীভাবে কাটা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাবিবুর রহমান এবং অ্যান্ড্রু ইগলের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ডেইলি স্টার পত্রিকায়। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় কীভাবে কাঠ মাফিয়াদের নজর পড়েছে সুন্দরবনে। কাঠের চোরাই কারবার থেকেই তৈরি হয়েছে পিরোজপুরের নেসারাবাদের বৃহত্তম ফ্লোটিং টিম্বার মার্কেট।

ওই রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৮৫ সালের আগে সুন্দরী গাছের গুঁড়ি খুল্লমখুল্লা বিক্রি হত। কিন্তু ওই বছর সংরক্ষিত প্রাণী এবং উদ্ভিদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসার ফলে সুন্দরী গাছ কাটা, বিক্রয় এবং পরিবণে নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়। তবে এখনও তা থামানো যায়নি।

ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, চোরাকারবারীরা বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। অনেক সময় সুন্দরী গাছের কাণ্ড নিয়ে যাওয়ার সময় নারকেলের ছিবড়ে দিয়ে তা ঢেকে রাখা হয়। প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে অনেক সময় আবার বস্তায় মুড়ে এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের মধ্যে দিয়ে গোপনে নিয়ে যাওয়া হয় সুন্দরী গাছ। এক কিউবিক সুন্দরী কাঠের দাম ৪০০ থেকে ১৫০০ টটাকা হওয়ায় চোরা শিকারিদের নজর থাকে এই গাছের উপর।

ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা

ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, অন্যান্য ম্যানগ্রোভ প্রজাতির মতো সুন্দরী গাছও অত্যন্ত কম লবণাক্ততায় (5 – 15 psu / Practical Salinity Unit) স্বাভাবিক থাকতে পারে। ফলে এটি সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির একটি ইন্ডিকেটর হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে পারে। জলে লবণের পরিমাণ কম রয়েছে- এরকম পরিবেশে সুন্দরী গাছের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে। ফিজিওলজিক্যাল স্টাডি থেকে জানা গিয়েছে যে, ম্যানগ্রোভ অরণ্য নুন ভালোবাসে না। বরং নুন সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে সুন্দরবনের জলে লবণের পরিমাণ অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক সঙ্কটের মুখে পড়েছে সুন্দরী গাছ। জলের লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরী গাছের বংশবৃদ্ধি ব্যহত হচ্ছে। থমকে যাচ্ছে সুন্দরী গাছের বৃদ্ধি। গবেষকদের অনুমান, জলে লবণাক্ততার পরিমাণ এভাবে বাড়তে থাকলে এক সময় গোটা সুন্দরবন থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে সুন্দরী গাছ। গবেষকরা আরও নির্দিষ্টভাবে জানিয়েছেন, সুন্দরবনের জলে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরাসরি আঘাত পড়েছে সুন্দরী গাছের ক্লোরোফিলে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে সুন্দরীর সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া। একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে লবণাক্ততার পরিমাণ 4 psu থেকে 15 psu এর মধ্যে থাকলে সুন্দরী গাছের বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়। কিন্তু লবণাক্ততার পরিমাণ এর থেকে বেশি বাড়লে তার সাথে মানিয়ে নিয়ে পারে না বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এই উদ্ভিদ।

গবেষকদের থেকে চমকে ওঠার মতো তথ্য জানা গিয়েছে। সুন্দরবন থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ১৮,০০০ এবং ৫৫,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। সুন্দরীর মতো কোনো উদ্ভিদ যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো সঙ্কটের মুখে পড়ে, তখন বিষয়টা সত্যিই খুব উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ পল আর এলরিচ (Paul R Elrich), মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোলজিস্ট জেরার্ডো সেবাল্লোস তাদের ২০১৫ সালের গবেষণা পুনরায় খতিয়ে দেখেছেন। এই গবেষণা সমগ্র বিশ্বে সংবাদের শিরোনাম হয়ে উঠেছিল। এই গবেষণার নাম ছিল “ষষ্ঠ পর্যায়ের ব্যাপক বিলুপ্তির মুখে পৃথিবী।” ১ জুন প্রকাশিত এই গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আগে যা অনুমান করা হয়েছিল, তার থেকে অনেক বেশি সংখ্যক প্রজাতি বিলুপ্ত হবে। লেখকরা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, “প্রজাতি চিরকালের জন্য বিলুপ্ত হচ্ছে। এদের প্রত্যেকেই আমাদের জীব বৈচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।।”

মেরুদণ্ডযুক্ত প্রাণীদের তুলনায় মেরুদণ্ডহীন প্রাণী এবং উদ্ভিদের উপর গবেষণা এবং নজরদারি প্রক্রিয়া বেশ কঠিন কাজ। এবং এই বিলুপ্তি এত দ্রুত গতিতে ঘটছে যে তা খতিয়ে দেখার মতো পর্যাপ্ত সময়ও বিজ্ঞানীরা পাচ্ছেন না। এটা সত্যিই একটা উদ্বেগজনক ব্যাপার। ঠিক এই কারণেই জীব বৈচিত্র বজায় রাখার উপর ফের একবার জোর দিচ্ছে রাষ্ট্রসংঘ। প্রত্যেক বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সবাইকে এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্মরণ করিয়ে দেয় ইউনাইটেড নেশনস।

Earth.Org সুন্দরবনের স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে আমাদের সামনে যে তথ্য তুলে ধরেছে, সেটাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্যাটেলাইট ডেটার তথ্য থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, সুন্দরবন ধীরে ধীরে ডুবছে। এবং এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, “মানুষের বৈআইনী দখলদারী ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর প্রায় ১৬ বর্গ কিলোমিটার করে অরণ্য হারিয়েছে সুন্দরবন।।”

চলতি বছরেই আম্ফানের তাণ্ডব নৃত্য দেখেছে সুন্দরবন এবং সংলগ্ন শহর কলকাতা। এটি এখনও পর্যন্ত এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। শহর কলকাতার চেয়ে সুন্দরবনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। জলের উচ্চতা প্রায় ১৬.৫ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। জলমগ্ন হয়ে পড়ে সুন্দরবনের সমস্ত নিচু এলাকা। ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত সুন্দরবনের কাছে অবশ্য ঘূর্ণিঝড় নতুন কিছু নয়। তবে বিগত কয়েক বছরে এর তীব্রতা এবং ফ্রিকোয়েন্সি অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। আগের তুলনায় এখন ঘন ঘন সাইক্লোন দেখা দিচ্ছে সুন্দরবনে। আম্ফানের আগে সুন্দরবনে আছড়ে পড়েছিল বুলবুল। এই ঘূর্ণিঝড়েও সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আম্ফান নিঃসন্দেহে সুন্দবরনে তীব্র সঙ্কট তৈরি করেছে। বিশেষত কোভিড-১৯ এর লকডাউনের সময়ই এই ঝড় আছড়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। আম্ফানের দরুণ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে ঠিক কতটা এবং কী ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি।

সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্কের প্রাক্তন ডিরেক্টর প্রদীপ ভ্যাস বলেন, এই ঘর্ণিঝড় (আম্ফান) হয়তো সুন্দরবন বদ্বীপের অনেক প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার পাশাপাশি বাসস্থান চ্যুত করেছে। মাছ থেকে সরীসৃপ কিংবা স্তন্যপায়ী প্রাণী, অনেকেই হয়তো এই ঝড়ে ব্যাপক সঙ্কটে পড়েছে বলা যায়। তবে আমি শিকারের বিষয়টা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছি, বিশেষত বন্য শুয়োর এবং হরিণের সংখ্যা নিয়ে। এদের সংখ্যা হ্রাস পেলে বাঘের খাদ্যের ভাঁড়ারে টান পড়বে আর সেক্ষেত্রে আরও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, লোকালয়ে প্রবেশ করার সম্ভাবনাও আরও বেড়ে যাবে। সুন্দরবনের বাঘ-মানুষের লড়াই আরও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুন্দরবন না থাকলে আম্ফানের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে আরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হত। তবে উপকূলবর্তী এলাকায় অবস্থিত সুন্দরবন ঝড়ের প্রথম ঝটকা সামলায়। মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করার আগেই ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে ধাক্কা খেয়ে ঝড়ের গতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কমে যায়। ফলে ক্ষয়ক্ষতি যতটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তার চেয়ে কম হয়। গবেষকরা বলেন, সুন্দরবনের দৌলতেই ঝড়ের গতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হ্রাস পায়। প্রাকৃতিক কারণেই ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র ঘূর্ণিঝড়ের মতো চরম আবহাওয়া সহ্য করতে পারে। সেই সাথে উপকূলবর্তী এলাকা সহ মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারীদের সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জেরে ম্যানগ্রোভের এই চরিত্র ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।

আম্ফানের তাণ্ডবের পর সুন্দরবন থেকে ক্ষয়ক্ষতির যেসব রিপোর্ট পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সেখানকার গাছপালার রং ফ্যাকাশে হলুদ হয়ে যাওয়া। কারণ ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের সাথে বয়ে আসা অতিরিক্ত নোনা জল গাছের সবুজ পাতাকে ফ্যাকাশে হলুদ করে দিয়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনের নদীনালা গুলিতে জলের যে অবস্থা, তার সাথে সরাসরি পরিবেশ দূষণ ছাড়া বাঁধ নির্মানের প্রভাব রয়েছে। যার ফলে মিষ্টি জলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে সুন্দরবনে।

১৯৭৫ সালে গঙ্গার উপর তৈরি করা হয় বিতর্কিত ফরাক্কা ব্যারেজ (বাঁধ)। কয়েক কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশে গঙ্গা প্রবেশ করার আগে এই ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধ নির্মাণের ফলে গঙ্গার স্বাভাবিক জলস্রোতের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। গঙ্গার অনেক উপনদীতে মিষ্টি জলের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষত সুন্দরবন অঞ্চলে এই সমস্যা তীব্র হয়ে ওঠে।

সুন্দরবন অঞ্চলে কর্মসূত্রে কুড়ি বছর কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকে ভ্যাস বলেন, ভারতীয় সুন্দরবনের সমগ্র কেন্দ্রীয় এবং পশ্চিমাংশ এখন সমুদ্রের জলে পুষ্ট হ্রদে পরিণত হয়েছে। টাইগার রিজার্ভে যাওয়ার জন্য আমরা যে বিশাল মাতলা নদী পেরোই, বর্ষাকাল ছাড়া তার জল অত্যন্ত লবণাক্ত থাকে। আমার আন্দাজ বলছে, ভারতীয় সুন্দরবনের ৯৫ শতাংশ সুন্দরী গাছ হ্রাস পেয়েছে। এখনও যে কয়েকটা সুন্দরী গাছ আছে, সেগুলি দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ সংলগ্ন আন্তর্জাতিক সীমানায়। তবে বাংলাদেশের পূর্বাংশের সুন্দরবনে যে পরিমাণ সুন্দরী গাছ দেখা যায়, তার সাথে এর কোনো তুলনাই হয় না।

ভারতীয় সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের স্থান দখল করেছে ধুন্দুল (Xylocarpus granatum), পসসুর (Xylocarpus moluccensis), কাঁকরা (Bruguiera gymnorhiza) গেওয়া (Excoecaria agallocha) এবং গরান।

আউটলুকের প্রতিবেদনে প্রকাশিত স্বপন কুমার সরকারের গবেষণা থেকে প্রজাতিগুলির গঠনে পরিবর্তনের বিষয়টি জানা গিয়েছে। তিনিও একই কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, বিগত তিন দশকে অনেক প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে। এমনকি বাংলাদেশের সুন্দরবনেও একই জিনিস ঘটেছে। তিনি বলেন, আমি দেখেছি ঐতিহাসিক ট্রি হার্ভেস্টিং, সিল্টেশন, রোগ এবং মাটির লবণাক্ততার কারণেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

সুরক্ষিত নেই বাংলাদেশের সুন্দরবনও। সেদেশের সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ টপ ডায়িং ডিজিজে জর্জরিত। এর জেরে ১৯৮০ সাল থেকে সেদেশের সুন্দরবনের ১৫ শতাংশ সুন্দরী গাছ নিশ্চিহ্ন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনে দেখা দিয়েছে ফাঙ্গাল ডিজিজ এবং ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ। ২০১৫ সাল থেকে বিগত পাঁচ বছরে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা সর্বাধিক বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যের অ্যাবেরিস্টিইথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অ্যান্ড আর্থ সায়েন্সেসের টিমের গবেষক কেটি ল্যুই অটি-কোট্রেল রিমোট সেন্সিং ডেটা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, সুন্দরী গাছের উপর ডাই-ব্যাকের প্রভাব পড়েছে ২৫ শতাংশ ম্যানগ্রোভে। সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ঘন ঘন বলে ব্যাপক সঙ্কটে পড়বে সুন্দরী গাছ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে ৩০ কোটি ভারতীয়কে কোভিড-১৯ টিকা প্রদানের পরিকল্পনা

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন আজ বলেছেন যে ২০২১ সালের আগস্টের মধ্যে ৩০ কোটি ভারতীয়কে কোভিড-১৯ প্রতিরোধের টিকা প্রদান করা হবে। এমনই পরিকল্পনা...

ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সম্বন্ধে ১১টি তথ্য

ম্যানগ্রোভ অরণ্য শুধু সুন্দরবনই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলেও দেখা যায়। তবে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ হল বিশ্বের বৃহত্তম। যে পরিবেশে ম্যানগ্রোভ বেড়ে...

নির্বিচারে ম্যানগ্রোভ নিধনে বিপদের মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র

আইন রয়েছে। রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তা সত্ত্বেও সুন্দরবনে নির্বিচারে চলছে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসলীলা। প্রশাসনের তৎপরতায় মাঝে মাঝে অভিযান চলে। থেমে যায় বেআইনী কারবার। কিন্তু...

মটন বিরিয়ানি থেকে লুচি-ছোলার ডাল, কলকাতার খাবারে মুগ্ধ হয়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনা!

শুধু করোনার তাণ্ডবই নয়, নানা কারণে ২০২০ একটি ‘আনলাকি’ বছর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। এমনটাই দাবি অনেকের। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে...

Recent Comments

error: Content is protected !!