শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০
Home country পৃথিবীর অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র বাংলাদেশের সুন্দরবন

পৃথিবীর অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র বাংলাদেশের সুন্দরবন

৪২৮ Views

অবিভক্ত বাংলায় পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছিল সুন্দরবন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর সুন্দরবনের অধিকাংশ অংশ বাংলাদেশের অধীনে চলে যায়। অবশিষ্ট অংশ রয়েছে ভারতের পূর্বাংশে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণাংশে। রাজনৈতিক সীমানার কারণে আজ চাইলেই এপার বাংলা বা ওপার বাংলার ভ্রমণ পিপাসুরা যাতায়াত করতে পারেন না। ভিসা, পাসপোর্ট সহ নানা শর্ত পূরণ করতে করতেই অনেক সময় ভ্রমণ পরিকল্পনায় বদল আনতে হয়। তবে সুন্দরবনের রূপ কিন্তু এখনও বদলায়নি। বিশেষত বাংলাদেশের সুন্দরবনের টানে বহু পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। বাংলাদেশের সুন্দরবনের আকর্ষণীয় স্থানগুলিতে এক ঝলকে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

কি রয়েছে সুন্দরবনে?

প্রচারের অভাবে এখনও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে পিছিয়ে রয়েছে উভয় বাংলার সুন্দরবন। অথচ একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠার  সমস্ত উপাদান মজুত রয়েছে সুন্দরবনে। জীববৈচিত্রে ভার সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং বিশ্ববিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এছাড়া বাংলাদেশের সুন্দরবনে রয়েছে চিত্রল হরিণ, বনমোরগ, শূকর, নানা ধরণের বাঁদর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, লতাগুল্ম, বৃক্ষের বিপুল সম্ভার এবং নানা প্রজাতির মাছ। সুন্দরবনে গাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সুন্দরী, কেওড়া, গরান, বাইন, গেওয়া, পশপর, গোলপাতা, হেতাল, ঝানা, সিংড়া, খলসা ইত্যাদি। সুন্দরবনের নদীতে কুমীর ছাড়াও রয়েছে প্রায় ৩৩ প্রজাতির সরীসৃপ। এছাড়া সুন্দরবনের রাতের সৌন্দর্য্য অসাধারণ। বিশেষত পূর্ণিমার রাতে সুন্দরবনের রূপ মোহময়ী হয়ে ওঠে। সুন্দরবনের আশপাশে রয়েছে পর্যটকদের জন্য অসংখ্য আকর্ষণীয় স্থান।

৬ বার রূপ বদলায় সুন্দরবন:

সুন্দরবন চব্বিশ ঘন্টায় কমপক্ষে ৬ বার রূপ বদলায়। ভোরে এক রূপ, দুপুরে অন্যরূপ, পড়ন্ত বিকালে আর এক রূপ এবং সন্ধ্যায় দেখা যায় আর এক রূপ। সুন্দরবনের মধ্য ও গভীর রাতে সৌন্দর্য আর এক রকম। রাতে যদি চাঁদের দেখা পান, তাহলে কেল্লাফতে! তবে এই সবকটি রূপ উপভোগ করতে হলে আপনাকে হাতে একটু সময় নিয়ে আসতে হবে। সুন্দরবনে ভ্রমণের সময় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনোরকম ঝুঁকি এড়াতে বনরক্ষীদের সঙ্গে রাখা বাঞ্ছণীয়।

হিরণ পয়েন্ট:

বাংলাদেশের সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হল হিরণ পয়েন্ট। এটি হল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ লোনাবন। এছাড়া এটি হল সুন্দরবনের দক্ষিণাংশের একটি সংরক্ষিত অভয়ারণ্য। এই অঞ্চলটি নীলকমল হিসেবেও পরিচিত। প্রমত্তা কুঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে, খুলনা রেঞ্জে হিরণ পয়েন্ট অবস্থিত। এটি হল ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের একটি অন্যতম ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান। যেহেতু অভয়ারণ্য, তাই এটি অনেক বাঘ, হরিণ, বাঁদর, পাখি ও সরীসৃপের নিরাপদ আবাসস্থল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখার অন্যতম একটি স্থান হল হিরণ পয়েন্ট। এছাড়া এখানে দেখা যায় চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, পাখিদের মধ্যে আছে সাদা বুক মাছরাঙা, হলুদ বুক মাছরাঙা, কালোমাথা মাছরাঙা, লার্জ এগ্রেট, কাঁদা খোঁচা, ধ্যানী বক প্রভৃতি। হিরণ পয়েন্টে প্রচুর কাঁকড়াও দেখা যায়। এছাড়া এখানে দেখতে পাবেন রং-বেরঙের প্রজাপতি। হিরণ পয়েন্ট থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে কেওড়াসুঠিতে রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। এই ওয়াচ টাওয়ার থেকে আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়।

কটকা-কচিখালি:

বাংলাদেশের সুন্দরবনের আর একটি আকর্ষণীয় স্থান হল কটকা-কচিখালি। কচিখালি সংলগ্ন সমুদ্র তীরবর্তী অংশের তৃণভূমি জাতীয় বনভূমি ১২০ বর্গমাইল এলাকায় কটকা-কচিখালি অবস্থিত। এটি একটি অভয়ারণ্য। এখানে সারা বছর বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখা যায়। এখানে ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে।

দুবলার চর:

দুবলার চর হল বাংলাদেশের সুন্দরবনের একটি উল্লেখযোগ্য দ্বীপ। এটি সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এই এলাকাটি হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা ও হরিণের জন্য বহুল পরিচিত। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মধ্যে এটি একটি বিচ্ছিন্ন চর। দুবলার চর মূলত জেলে গ্রাম। এখানে মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শোকানোর কাজ। প্রতি বছর কার্তিক মাসে (নভেম্বর) হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাসমেলা এবং পূণ্যস্নানের জন্যও বাংলাদেশের সুন্দরবনের এই দ্বীপ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। এছাড়া এটি হল একটি নয়নাভিরাম দ্বীপ। এখানে চিত্রল হরিণের দলকে ঝাঁকে ঝাঁকে চরতে দেখা যায়। এই দ্বীপকে দুবলার ট্যাকও বলা হয়। দুবলার মাটি খুঁড়লে মিষ্টি জল পাওয়া যায়।

করমজল:

সুন্দরবনের আর একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্র হল পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের অধীনে অবস্থিত করমজল পর্যটন কেন্দ্র। নদীপথে খুলনা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এবং মংলা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই পর্যটন কেন্দ্র। এখানে একটি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও এখানে হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র আছে। মংলা থেকে ইঞ্জিন নৌকায় চড়ে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে করমজলের জেটিতে পৌঁছানো যায়।

জামতলা সমুদ্র সৈকত :

সুন্দরবনে যে কয়েকটি সমুদ্র সৈকত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল জামতলা সমুদ্র সৈকত। সুন্দরবনের কটকা ওয়াচ টাওয়ারকে পিছনে রেখে সোজা উত্তরে প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটলে জামতলা সমুদ্র সৈকত পৌঁছানে যায়। এই সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর জাম গাছ দেখা যায়। সেই থেকেই এলাকার নামকরণ করা হয়েছে। যারা নির্জনতা পছন্দ করেন তাদের জামতলা সমুদ্র সৈকতটি অবশ্যই পছন্দ হবে। এখানে প্রচুর কাঁকড়া দেখা যায়। জামতলা সমুদ্র সৈকতটি স্নানের জন্য আদর্শ জায়গা নয়।

অভয়ারণ্য:

বাংলাদেশের সুন্দরবনে বর্তমানে তিনটি অভয়ারণ্য রয়েছে। এগুলি হল কটকা কচিখালি অভয়ারণ্য, নীলকমল অভয়ারণ্য ও পশ্চিম অভয়ারণ্য। নীলকমল অভয়ারণ্য হিরণ পয়েন্ট ও নীলকমল এলাকায় পর্যটকদের খুবই আকর্ষণীয় স্থান। ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণকে এই এলাকায় বিচরণ করতে দেখা যায়। মোট এলাকাটি ১১০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। মংলা বন্দর থেকে এখানে যেতে প্রায় ৭ ঘন্টা সময় লাগে।

কিভাবে বাংলাদেশের সুন্দরবনে পৌঁছবেন:

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মতিঝিল, আরামবাগ, শ্যামলী, কল্যাণপুর, গাবতলী থেকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এসি/ননএসি বাস খুলনার উদ্দেশে রওনা হয়। খুলনায় নেমে লোকাল বাসে মংলা যাওয়া যাবে। এছাড়া সায়েদাবাদ থেকে সুন্দরবনের জন্য বিভিন্ন বাস খুলনা, বাগেরহাট ও মংলার উদ্দেশে রওনা হয়। খুলনায় ট্রেনে এবং যশোর পর্যন্ত বিমানে করেও যাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি নৌপথেও বাংলাদেশের সুন্দরবনে পৌঁছানো যায়।
সুন্দরবনে প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত তথ্য:

বাংলাদেশের সুন্দরবনে প্রবেশাধিকার অবারিত নয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চল হওয়ায় বনবিভাগের অনুমতি বাধ্যতামূলক। বিনা অনুমতিতে সুন্দরবনে প্রবেশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুন্দরবনে ভ্রমণ করতে হলে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার বাগেরহাট বা ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার খুলনার অফিস থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ করে ফি জমা দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

করোনা আক্রান্ত পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা, আরোগ্য কামনায় পূজার আয়োজন করল তৃণমূল

বিশ্বজিৎ মান্না পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল তৃণমূল কংগ্রেস।...

আইপিএল ২০২০: সম্পূর্ণ সূচি, তারিখ, ভেনু

বহু প্রতিক্ষিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে ভারতের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে আইপিএল। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে...

বাবর আজমকে দিশাহীন মনে হচ্ছে: শোয়েব আখতার

ম্যাঞ্চেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠি দ্বিতীয় টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৬ রানের টার্গেট সহজে পৌঁছে গিয়ে ৫ উইকেটে জয় অর্জন করেছে আয়োজক...

আইপিএল ২০২০: চেন্নাই সুপার কিংসে রায়নার স্থান দখল করতে পারেন ঋতুরাজ গায়কোয়াড়

ইদানিং বেশ কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে চেন্নাই সুপার কিংস। আইপিএল ২০২০ শুরু হওয়ার আগেই স্কোয়াডের মোট ১২ জন সদস্যের কোভিড-১৯ পরীক্ষার...

Recent Comments

error: Content is protected !!