সোমবার, মে ১৭, ২০২১
Home village স্বামীর প্রাণ গিয়েছে রয়্যাল বেঙ্গলের থাবায়, তবুও জঙ্গলে যাওয়া ছাড়া পারুলের কোনো...

স্বামীর প্রাণ গিয়েছে রয়্যাল বেঙ্গলের থাবায়, তবুও জঙ্গলে যাওয়া ছাড়া পারুলের কোনো উপায় নেই

২৪৮ Views

এক শীতের দুপুর। ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকায় তখন মাছ ধরার জাল টানছেন পারুল হালদার। তার পিছনেই রয়েছে সুন্দরবনের ঘন জঙ্গল। প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত সুন্দরবনের অধিকাংশটাই রয়েছে বাংলাদেশে। বাকিটা পশ্চিমবঙ্গে।

বছর চারেক আগে পারুলের জীবনে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। জঙ্গলের ভিতরে খাঁড়িতে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি পারুলের স্বামী। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের থাবায় তার প্রাণ যায়। তার সঙ্গে থাকা দুই সঙ্গী দেখেন, তার দেহ টেনে নিয়ে যাচ্ছে বিশাল আকৃতির এক রয়্যাল বেঙ্গল। সুন্দরবনে প্রতিবছর বাঘের আক্রমণে এরকম অনেক মানুষের মৃত্যু হয়।

চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অথৈ জলে পড়েন পারুল। যে বিপদে স্বামীর প্রাণ গিয়েছে, এখন সেই পেশাতেই, অর্থাৎ জঙ্গলের খাঁড়িতে মাছ ধরেই তিনি সংসার চালান। আর কোনো উপায় নেই। শুধু পারুলই নন, ভারত এবং বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থাকা সুন্দরবনে এরকম অনেক পারুলের কাহিনী রয়েছে। বিপদ আছে জেনেও তাদের জঙ্গলে যেতে হয় পেটের টানে।

সুন্দরবনের অর্থনীতির চিত্রটা বিগত কয়েক দশকে অনেক বদলে গিয়েছে। কৃষি থেকে আগের মতো রোজগার হয় না। ফলে মানুষ কৃষির বদলে বিকল্প পেশার সন্ধান করছেন। সুন্দরবন থেকে ভিনরাজ্যে বা দেশের বাইরে শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে মূলত পুরুষরাই সেটা করেন। পারুলের মতো অনেককেই থাকতে হয় নদী, বদ্বীপের দেশ সুন্দরবনে। রুজি-রুটির জন্য তাদের কাছে ভরসা জঙ্গল আর নদী। এতেই রয়েছে তাদের বেঁচে থাকার রসদ।

মাঝ ধরে ফেরার পর ভারতীয় সুন্দরবনের অংশ সাতজেলিয়া দ্বীপের বাসিন্দা, ৩৯ বছরের পারুল তার কুঁড়ে ঘরের সামনে বসে বলছিলেন, আমি যখন গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করি, তখন মনে হয় প্রাণটা আমার হাতে নিয়েই জঙ্গলে যাচ্ছি।

তার সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি বছরের অধিকাংশ সময় নদী থেকে মাছ ধরেন। কাঁকড়া ধরার জন্য মাসে দুবার করে তিনি গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেন। সেখানে পৌঁছানোর জন্য জরাজীর্ণ ডিঙি নৌকাতে ছয় ঘন্টা ধরে দাঁড় টানতে হয়। সাথে থাকেন তার মা। এতকিছু করে মাসে তার রোজগার হয় মাত্র ২,০০০ টাকা। মাছ এবং কাঁকড়া ধরার এই টাকা দিয়েই তার সংসার চলে, ছোট মেয়ে পাপড়িকে স্কুলে পাঠান। পারুল বলেন, জঙ্গলে না গেলে পর্যাপ্ত খাবার জোগাড় করতে পারব না।

সুন্দরবনের অধিকাংশ লোজকনের মতো পারুল ভিনরাজ্যে কাজ করতে সুন্দরবন ছাড়তে পারেন না। কারণ তার ১১ বছরের মেয়ে পাপড়ি। সে স্কুলে যায়। পারুল যদি বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও কাজের সন্ধানে চলে যান, তাহলে তার দেখভাল করার মতো কেউ থাকবে না। পারুল চান তার চেয়ে যেন তার মেয়ের জীবনটা আরও ভালো হয়। তাই যেকোনো মূল্যেই মেয়ের পড়াশুনা তিনি চালিয়ে যেতে চান।

তথ্যঋণ: দ্য অয়্যার এবং সংবাদসংস্থা রয়টার্স

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ফের মৃত্যু

শাহীন বিল্লা, সাতক্ষীরাসুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে রেজাউল ইসলাম নামে এক মৌয়াল নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (১৪ মে) বিকেলে বাংলাদেশের পশ্চিম...

দৈনিক সুন্দরবনের সাংবাদিককে মারধর

দৈনিক সুন্দরবন ওয়েবসাইটের এক সাংবাদিককে মারধর করার অভিযোগ উঠল কুলতলিতে। কোভিড বিধি না মেনে শুক্রবার কুলতলীর রামকৃষ্ণ আশ্রমের কাছে জেটিঘাটে অনেকে ভিড়...

বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিতে হবে: মোদিকে চিঠি বিরোধীদের

ভারতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ক্রমশই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। হাসপাতালো রুগীর জায়গা নেই। অক্সিজেনের অভাব। ভ্যাকসিনের অভাব। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে।...

অতিমারির অন্ধকারে ঈদে চাঁদ যেন আশার আলো

সীতাংশু ভৌমিক, ফরিদপুর (বাংলাদেশ) প্রতিবছর ঈদ আসে, পরিযায়ী শ্রমিক-কর্মজীবী মানুষেরা স্বজনদের কাছে ফিরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ থেকেই...

Recent Comments

error: Content is protected !!