শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০
Home feature অভিমানিনী

অভিমানিনী

১৮৫ Views

আলো ঘোষাল

মাথার কাছে ঘড়িটার শব্দ ক্ষীণ মনে হচ্ছে, প্রতিটা সেকেন্ড যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে চলেছে, মৃত্যু যেন প্রহর গুনে চলেছে। ঝাপসা হয়ে ওঠা দৃষ্টিতে, দেখতে পাচ্ছি সাদা পোশাকের ছোটাছুটি, চরম ব্যস্ততা ঘিরে রয়েছে। মৃত্যু পথযাত্রী সাধারণ নন তাদের কাছে। দূরে কেবিনের প্রায় শেষ প্রান্তে যে মানুষটা সমস্ত ঝড় মাথায় করে বসে, সে আমার ‘চন্দন’। আমি প্রহর গুনে চলেছি কখন মৃত্যু আমাকে আলিঙ্গন করবে আর আমি সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো। কিন্তু যতবার ঝাপসা চোখ চন্দন কে দেখে না চাইতেও হৃদয়ের গভীর থেকে একটি বাক্য কন্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে ‘আমি বাঁচতে চাই’

শিলিগুড়ির গা ঘেঁষে থাকা ঘর গুলো, যেখানকার অধিকাংশ মানুষ চাঁদকে ‘ঝলসানো রুটি’ মনে করে ঘুমিয়ে পড়তো তেমনই এক প্রায় শ্রীহীন পরিবারে আমার জন্ম। দুই কন্যা সন্তানের পর মা বাবার ইচ্ছে ছিলো এবার পরিবারে ছেলে জন্ম নেবে, ছেলে তো নয় টাকা উৎপাদনের মেশিন। ভাগ্যের কি চরম পরিহাস আবার একটি মেয়ে! মেয়ে বলে রেহাত হলো কই, চার বছর বয়েস হতে না হতেই ছুড়ে দেওয়া হলো সেই যন্ত্র হিসেবে যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে টাকা। কলকাতার তিন নম্বর চেতলা হাট রোডের ঘিঞ্জি বস্তিতে ঠাঁই হলো, পেছনে ফেলে এলাম পাহাড়ের কোলে থাকা ছোট্ট শহরটাকে, যার বুক চিরে রাশি রাশি ধোঁয়া তুলে ছুটে যাওয়া নিত্যদিনের ট্রয়ট্রেনটা হারিয়ে গেলো। এক ধাক্কায় ওই বয়েসে আমি কেমন যেনো বড় হয়ে গেলাম। রোজ পঞ্চাশ টাকা হাজিরায় ‘শিশু শিল্পীর’ পর্দায় আসা। সালটা তখন ‘৪৭ /’৪৮ হবে। সারাদিনের খোরাক বাসি রুটি।ছুটে চলেছি এদিক থেকে ওদিক, টাকা আর টাকা, প্রতিদিন খিদে ধরা পেটে, মনের ভেতর চলতে থাকা যুদ্ধগুলোকে অন্ধকারে রেখে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে হাসি হাসি মুখে নিজেকে সাজিয়ে দিতাম চলমান ক্যামেরার সামনে। কেউ শেখায়নি তবু শিখে গিয়েছিলাম সাজঘর থেকে বেরিয়ে শট দেওয়ার সময়ের আমি আর শট শেষ হওয়ার পর আমি এই দুইজন আলাদা একেবারে ভিন্ন দুইজন। ঘরে পুড়ে চলা শৈশব আর ফ্লোরে ফুটিয়ে তোলা শৈশব , কি যে কঠিন তা বুঝতে অসুবিধা হলেও কোনোদিন অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি এই জীবনে।ভার বহন করা সেই বয়েসে কঠিন মনে হয়নি, হাসিটুকু ধরে রাখতাম আমার ঠোঁটের দুইপাশে, মা বলতেন ‘বাবু তুই পারবি আমাদের একটা ভালো জীবন দিতে, তোকে পারতেই হবে’, দ্বিধাহীন ভাবে মাথা নাড়িয়ে সহমত জানিয়ে এসেছি বারেবারে। আর মনের গোপন কথা, কান্না, হাসি রেখে দিতাম পাথরের কাছে। রাস্তায় যেখানেই পাথর পেতাম কুড়িয়ে নিয়ে আসতাম, ওদের সাথে গল্প করতাম, আবার ওদের শাসন করতাম। ওরাই তো ছিলো আমার একান্ত আপন, যারা কোনো কথা বলে না কিন্তু সব সইতে পারে।  শৈশব ধীরে ধীরে অস্তমিত হলো, সদ্য কিশোরীর বাড়তে থাকলো কাজের চাপ। এবার নায়িকা হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার সময়। সে সময়ের নামী দামী নায়কদের বিপরীতে নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করেছি, পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে পারিশ্রমিক। চেতলার ভাড়া বাড়ি ছেড়ে উঠে এলাম টালিগঞ্জ এর অভিজাত পাড়ায়। বাসি রুটি কিন্তু তখনও ছাড়িনি। ‘আজ মজলিসে’ সে কালের প্রস্তাবিত একটি নামী ব্যানারের ছবি, প্রথমে ঠিক ছিলো তখনকার নামী অভিনেত্রী সুরমাবালা মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন কিন্তু তিনি হঠাৎ বেঁকে বসলেন অগত্যা পরিচালক আমার নাম প্রস্তাব করলেন। প্রযোজক আমার সাথে সাক্ষাত করে আমায় নাকচ করলেন, এদিকে পরিচালক জেদ ধরে বসলেন যদি তার পছন্দের নায়িকাকে না নেওয়া হয়, তিনি এই ছবিটিই করবেন না, অগত্যা প্রযোজক রাজী হলেন। শুভ মহরতে প্রথম দেখলাম পরিচালককে, এতো সেই যাকে আমি স্বপ্নে দেখি, যে আমার হৃদয়ে ঝড় তুলে আবার মিলিয়ে যায় – সেই চন্দন সেন, আমার চন্দন। ছন্দহীন কবিতা ক্রমাগত তার রস ক্ষরণ করে চলেছে।’দিন যায় ধীরে ধীরে, রাতের নিশ্চল অন্ধকারে

বেবাক মুহূর্ত অতল গহ্বরে’

 এমন অনেক কবিতা এখনও আমার ডায়েরিতে, জানিনা কেউ কোনোদিন তার মুখ দেখবে কিনা তবু আছে কারণ ওদের থাকতেই হতো আমার জন্যে চন্দনের জন্যে। এই ভালোলাগা শুধু মঞ্জুর একার তখন সেখানে চন্দন ছিলো কিন্তু তার শরীর মন কিছুই ছিলো না! তবু চন্দন ছিলো শুধু তফাত টা ছিলো এখানেই যে সে জানতো না যে সে ছিলো!

‘আজ মজলিসে’ আমার কাছে শুধু একটা ছবি নয়, একটা যাত্রাপথ ভালোলাগা থেকে ভালোবাসাতে যার উত্তরণ।

যেদিন ছবিতে সই করে এলাম সেদিন আমায় পায় কে, আনন্দঘন সন্ধ্যা তখন ভালোলাগার বৃষ্টিতে ভিজে চলেছে। সদ্য কেনা পোর্শা গাড়ি হাঁকিয়ে বাবা আর মেজো দিদি কে নিয়ে রওনা হলাম বর্ধমানের উদ্দেশ্য, বর্ধমান শহরে ঢোকার মুখে ঘটে গেলো সেই ঘটনাটি যা অনভিপ্রেত ছিলো। পরদিন সব দৈনিকের বড়ো খবর হয়ে দাঁড়ালো ‘অভিনেত্রী মঞ্জু আহত’, একটি কালো গাড়ি গড়িয়া থেকে রওনা হলো বর্ধমানের উদ্দেশ্যে, সেই যে শুরু হলো যে কয়দিন ভর্তি ছিলাম রোজ আসতো নিয়ম করে।

প্রথম যেদিন চন্দন গুলদাস্তা হাতে নিয়ে আমার কেবিনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো ‘মঞ্জু কেমন আছো’ সেই আমার লজ্জার হাসি আজ আবার অনেকদিন পর যখন বাঁচতে সাধ হচ্ছে তখন আবার ঠোঁটের কোণে বারবার তার আবেশটুকু লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। হয়তো চন্দন আমার হাত ধরে বুঝেছিলো আমি কি চাই ঠিক সেখান থেকেই ভালোলাগা ভালোবাসায় মিশে যেতে শুরু করেছিলো। পরিণয় যার পরিণতি হতে পারতো সেখানে শত্রু বেশে দাঁড়ালো আমার পরিবার, সোনার হাঁসকে কেউ কি হাত ছাড়া করে!!? প্রযোজক শেঠ জগনলাল জুয়ার ময়দানে বেশ ভালো লোকসান করে বন্ধ করে দিলেন ‘আজ মজলিসে’ কিন্তু তাতে হৃদয় মরে গেলো না যোগাযোগ রয়ে গেলো আড়ালে। একের পর এক ছবি করে চলেছি, লোকে আমায় ঠাট্টা করে বলতো ‘ট্রাজেডি কুইন’, আমার মতো কথায় কথায় কেউ নাকি কাঁদতে পারে না! কান্নার সাগরে যার সবটুকু শরীর ডুবে থাকে তার সর্ষের তেল কি কাজে লাগবে!

‘শব্দ তো এসেছিলো, কিন্তু কোথা থেকে

বুঝতে পারিনি হয়তো হৃদয় থেকে’

ঠিক তাই হৃদয় থেকে, সেদিন ফোনের ওপাশ থেকে চন্দন বলেছিলো

‘চলো মঞ্জু বিয়েটা করে ফেলি’

আনন্দঘন আবেগে বলেছিলাম, ‘তোমার কি মনে হয় আমি তা চাইনা, চাই একশোবার চাই কিন্তু বাবা যে মেনে নেবে না!’

চঞ্চল চন্দন বলেছিলো’ কেনো মেনে নেবে না?!’ এই কেনো এর উত্তরটা আজ হয়তো কেউ কেউ জানে কাল হয়তো সবাই জানবে কিন্তু সেই ‘কেনো’ র উত্তরটা আমি সেইদিন দিতে পারিনি, আমি বলতে পারিনি এই পরিবারটা তার সুখ শান্তি কেনার জন্যে আমাকে মানে অভিনেত্রী মঞ্জুকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, মঞ্জুর জন্যে ওরা মঞ্জুকে চায় না!

কিন্তু বিয়ে করাটা আমাদের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলো। প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টায় বাবাকে নিয়ে যেতে হতো ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে সেইদিনটা ছিলো একুশে জানুয়ারি১৯৫৫, ঠিক ছয়টায় গাড়ি ক্যামাক স্ট্রিট এর ক্লিনিক এ ঢুকে গেলে বিপরীতদিক সেই কালো গাড়িতে উঠে সোজা কালীঘাট, পুরোহিত তৈরি, বিলম্ব না করে বিবাহ সম্পূর্ণ। আগে যখন বাল্য বিবাহ হতো তখন একটা শর্ত থাকতো কন্যা যৌবনে পদার্পণ করলে সে বাপের ঘর থেকে স্বামীর ঘরে আসবে আর আমাদের মধ্যের চুক্তিটি হলো বাবা যেদিন মেনে নেবেন সেদিনই ফিরে যাবো চন্দনের কাছে। ঠিক নয়টা পনেরো মিনিটে পৌঁছে গেলাম ক্লিনিক এ, বাবা সাড়ে নয়টায় বেরিয়ে এলেন। বেশ অবাক হলেন মাথায় প্রায় সিথি ছোঁয়া সিঁদুর দেখে, বিষয়টি সন্দেহের কিনা তা অনুধাবন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি তখন, কিন্তু বাস্তব আর সত্যিকে চেপে রাখা বেশিদিন সম্ভব হয়নি। পরিবার থেকে দাবী উঠতে শুরু হলো চন্দনকে আমি যেনো ডিভোর্স দিই। না দিই নি কেনো দেবো!, ভালোবাসার এটাই তো পরিণতি আমার চোখে। বন্ধ হয়ে গেলো চন্দন এর সদ্য শুরু হওয়া ‘সোনার শিকল’ আমার কাজ করা বাবা হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন ‘গুরুদেব রাহা কে আমি কথা দিয়েছি, ওঁর ছবিই তুমি করবে, চন্দনের সাথে কোনো কাজ নয় আর যদি তা করো তাহলে এ বাড়ির দরজা তোমার জন্যে বন্ধ হয়ে যাবে’ সোনার শিকল পড়ে রইলো আমি বাবার কথামতো চললাম কিন্তু টিকতে পারলাম কই ছবি পড়ে রইলো এক দৌড়ে পৌঁছে গেলাম সোনার শিকলের সেটে। সেই যাওয়া আমার কাল হলো, রাতে যখন বাড়ি ফিরলাম’ সাধের বাড়ির’ দরজা বন্ধ হয়ে গেলো মুখের সামনে। আমার চারদিক কেমন যেনো অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো, আমি ভয় পেয়েছিলাম। কান্না আমার সবটুকু নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো, চোখের দুইপাতা নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভিজে চলেছিল। চিৎকার করে বলেছিলাম ‘বাবা দরজা খুলে দাও, আমি শুধু একবারের জন্যে নিজের ইচ্ছেকে সম্মান করতে চেয়েছিলাম, তা যদি ভুল হয়ে থাকে – আমি আর সেই ভুল করবো না, দরজা খুলে দাও’ নাহ সেই দরজা আর খোলেনি!

লাল পোর্শা গাড়িটা কোনো রকমে চালিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলাম চন্দনের বাড়ির সামনে। খবর পেয়ে চন্দন বাড়ি এসেছিলো, আমার হাত ধরে বলেছিলো ‘মঞ্জু, এই সেই বাড়ি, যেখানে এখন থেকে তুমি থাকবে কিন্তু দেখো ভাগ্যের কি চরম পরিহাস তোমাকে স্বাগত জানানোর জন্যে কোনো রোশনাই  নেই, বরণডালা নেই’ মৃদু হেসেছিলাম। নিজের ভালোবাসার মানুষটির সাথে থাকতে পারবো এর থেকে বড় কিছু হয় নাকি আর তাছাড়া এই তো প্রথম মঞ্জু তার নিজের সিদ্ধান্তকে সম্মান দিতে পেরেছে তাই বা কম কিসে!

সং সেজে সার বোঝা তাই তো সংসার, সে তো বেশ চলছিলো। দুইজনই ভীষণ ব্যস্ত নিজের নিজের কাজের গণ্ডিতে কিন্তু একটা চাপা মানসিক অবসাদ ছিলো, ডাক্তার বোস পরামর্শ দিলেন প্রতিদিন একটু করে ব্র্যান্ডি খেতে। শুরু করলাম, বেশ কাজ দিচ্ছিল। একের পর এক সফল ছবি আমার ঝুলিতে আসতে শুরু করলো। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় শুরু করলাম, সবটুকু প্রশংসা নিজের কাছে গুছিয়ে রাখতে শুরু করলাম। আমি জানতাম আমার সবটুকু কখনো সইবে না, আমি জানতাম আমি যতোই আমার বাপের বাড়ির পরিবার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি না কেনো তারা আমার ও আমার চন্দনের মাঝে এসে দাঁড়িয়ে সম্পর্কটাকে দুমড়ে মুচড়ে ভাঙ্গতে চাইবেই! হলোও তাই । সদ্য একটি ছবি শেষ করে প্রায় পনেরো দিন পর বাড়ি ফিরলাম, এসে শুনলাম নতুন পরিচালক বিকাশবাবু দুইবার এসে ফিরে গেছেন, বেশ গম্ভীর মুখে চন্দন আমাকে বললো  ‘যদিও আমি ওকে বলে দিয়েছি এই চরিত্রে তুমি অভিনয় করবে না, তবুও তুমি দেখে নিও মনে হয় না করাই ভালো।’ আমি অবাক হয়ে ওর মুখ দেখছিলাম আর মনে মনে এই উত্তর নিজেকে দিচ্ছিলাম, ঠিক যেদিন ‘সাধের বাড়ি’ আমি ছেড়ে এসেছিলাম ঠিক তখন থেকেই আমি আজকের মঞ্জু হয়েছি, যে তার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে। প্রত্যুত্তরে হাসির রেশ টেনে বলেছিলাম ‘আগে শুনি পুরো বিষয়টি তারপর সিদ্ধান্ত নেবো’ জানতাম এই সন্দেহের জাল কর্তৃত্ব করার ইচ্ছে চন্দনের মাথায় কে বা কারা ঢুকিয়ে চলেছে! আমি বিকাশবাবুর ছবিটি করেছিলাম, এক প্রায় মাতাল বধূর চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। ছবিটি দেখে চন্দন আমাকে বলেছিলো ‘এই চরিত্র তুমি ছাড়া আর কেউ করতে পারতো না’। কয়েকদিনের জন্যে উটি ঘুরতে গিয়েছিলাম। পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে আমার ভেতরের অভিমান যে জাগ্রত হচ্ছিল তার সঙ্কেত আমি পাচ্ছিলাম বটে কিন্তু তার পরিণতি এতো ভয়াবহ হবে কোনোদিন ভাবিনি। চন্দন তার নতুন ছবি ‘অভিমানিনী’র গল্প আমার কাছে তুলে ধরে, আমি কথা দিই মৃত্যুর আগে হলেও এই ছবিটি আমি করবো! কিছু অংশের শুটিংও ফিরে এসে শুরু করে দিই।

সেদিন মার্চের প্রায় শেষ কোলকাতার গরমটা একটু একটু করে বাড়ছে, সন্ধ্যেটা বেশ নরম। সেদিন সারাদিন বাড়িতে ছিলাম প্রায় রাত আটটায় চন্দন বাড়ি ফিরেছিলো বেশ ক্লান্ত। চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে সামনে বসেছিলাম। চন্দন আমাকে হঠাৎ এমন এক কথা বললো যা আমি ভাবতেই পারিনি  ‘মঞ্জু, তুমি এবার ছবি করা বন্ধ করে দাও’ নিজেকে সামলে আমি উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলাম তা সম্ভব নয়। চন্দন বেশ খানিকটা মুষড়ে জবাব দিয়েছিলো ‘বুঝতে পারি তা তোমার জন্যে সম্ভব নয় তাহলে অন্তত আমার তিনটে শর্ত মেনে নাও, আমাদের নিজেদের মধ্যে সময়ের আস্তরণ পড়তে পড়তে না হলে আমরা হারিয়ে যাবো’, সেটা বুঝতাম যে আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছিলো, আমি কথা দিই আমি এ ব্যপারে চন্দনের সব শর্ত মানতে প্রস্তুত।

প্রথম শর্তটি ছিলো আমার সাজঘরে যেনো কেউ প্রবেশ না করে যখন শুটিং চলবে

দ্বিতীয় শর্তটি হলো যেখানেই থাকি যাই থাকুক সন্ধ্যে ছয়টায় যেনো বাড়িতে ঢুকে যাই

আর শেষ ও তৃতীয় শর্তটি হলো কোনো ছবি করার আগে আমি যেনো চন্দনের মতামত যেনো নিয়ে নেই

অদৃশ্য যে বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিলো তা যে ফল দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত তা বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছিলাম, তাই কথা দিয়েছিলাম আমি এগুলো পালন করবো অন্যথা হলে চন্দন এই বাড়ির দরজাও বন্ধ করে দিতে পারে কিন্তু চন্দন চায়নি এই কথা বলতে। মানুষ যখন তার প্রিয় মানুষকে সবচেয়ে অপ্রিয় কথাটি বলে তখন বুঝে নিতে হবে তার পিছনে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উৎসাহ আছে, আর এই তৃতীয় ব্যক্তিটি যে আমার বাপের বাড়ির কেউ তা আমি ভালোই বুঝেছিলাম কিন্তু তবুও শর্তগুলো আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয়নি। মনে না হওয়ার পিছনে আমার ভালোবাসা যার মাপকাঠির জন্যে কোনো মানদন্ডের প্রয়োজন হয় না। ‘অভিমানিনী’ ছবির কিছু কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু তখন তো আমি এ দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম অভিনেত্রী, হাতে অনেক কাজ, তাই ধীর লয়ে ‘অভিমানিনী’ ছবির কাজ এগুতে শুরু করেছিলো।

চাকা যেমন অনবরত ঘুরে চলে, থমকে যাওয়া যেমন তার বৈশিষ্ট্য নয়, আমিও তেমন থামতে পারি না। শর্তগুলো আমার সাথেই ছিলো কিন্তু তার চাপাচাপি একটু একটু করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেটা বুঝতে পারছিলাম। আকারে ইঙ্গিতে চন্দন আমাকে বুঝিয়ে দিতে চাইছিলো যে সে পছন্দ করছে না যে আমি চন্দন ছাড়া আর কারো সাথে কাজ করি! কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমি নিজেকে তুলে ধরেছি নিজের পরিচয়ে কারো পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারবো না। নিজের অস্তিত্ব আর নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অস্তিত্ব দুইয়ের দ্বন্দ্ব আমার শরীরে সুরা সেবনের মাত্রা বাড়তে থাকে। মনের উপর চাপ যে পড়ছিলো তার প্রভাব আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে অনেকটাই আঘাত করেছিলো। আমি আর পেরে উঠছিলাম না, নিজের সাথে নিজের লড়াই থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলাম। চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, হৃদয়ে তখন পাথর চাপা দেওয়ার পালা। আবার সেই গাড়ি হাঁকিয়ে ছেড়ে চলে এলাম চন্দনের বাড়ি ছেড়ে উঠলাম মালার বাড়িতে। আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু মালা, আমার ইচ্ছেকে সেদিন ও সম্মান করেছিলো। সারা রাত সব জায়গা খুঁজে প্রায় মাঝরাতে চন্দন এসেছিলো মালার বাড়িতে। আমি দরজা খুলি নি, এবার আমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বাইরে দাঁড়িয়ে চন্দন অনেক অনুরোধ করেছিলো শেষে বলেছিলো ‘যদি তুমি আজ আমার সাথে না ফিরে আসো তাহলে আর কোনোদিন আমি তোমাকে নিতে আসবো না’। আমার ভেতর বাহিরে তখন ভীষণ ঝড় তবু এই প্রথম নিজের এতোবড় সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছিলাম।

যতোদিন এগিয়েছে আমার ব্র্যান্ডির পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছিলো, এমন অবস্থায় পৌঁছে গেলাম যখন সারাটা দিন আমার সময় কাটতো বিছানায়। ডাক্তার বোস বারণ করলেন ‘প্লিজ আর খাবেন না, তখন প্রয়োজন ছিলো আর এখন এটা আপনার ক্ষতি করছে’, ঠোঁটটা কাঁপছিলো সারা শরীর জুড়ে ক্লান্তি তবু হাসিটাকে সজোরে সারা মুখে ফুটিয়ে ঘোষণা করলাম ‘কে সে, যে বাঁচতে চায়!?’

শরীর আরও খারাপ হতে শুরু করলো, প্রায় নয় মাস সময় কেটে গিয়েছে আমি আর চন্দন দুজন দুজনকে দেখিনি বা স্পর্শ করি নি। ভেতরটা ক্রমে ক্রমে ক্ষয়ে যাচ্ছে, পেটের ব্যথাটাও পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। মালা আর কোনো কথা শোনেনি আমাকে নিয়ে রওনা দিলো লন্ডনে ধরা পড়লো সিরোসিস অফ লিভার।

প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেকটাই সেরে উঠলাম, প্রায় এক বছর বিদেশে কাটলো। ফিরে এলাম দেশে অনেকটাই সুস্থ। কিন্তু নতুন করে কাজ করা আর সম্ভব হচ্ছিলো না। আর্থিক ভাবে প্রায় দুর্বল হয়ে পড়লাম। বুঝতে পারছিলাম আর বেশিদিন নিজেকে টানা সম্ভব নয়।

প্রায় দুইবছর পর চন্দনের চিঠি পেলাম ছত্রে ছত্রে জড়িয়ে আছে আবেশ সেই ভালোবাসার, যার শুরু হয়েছিলো বর্ধমানের হাসপাতালে। একা নিঃসঙ্গ জীবন আমার এখন, বিছানায় পড়ে থাকে চার পাঁচটা পাথর,পূবের জানালা দিয়ে নরম হাল্কা একটা বাতাস ছাড়া আর এই বাড়িতে ঘরে কেউ আসে না। ভালো লেগেছিলো, চিঠিটা এসেছিলো বলে কিন্তু এক গভীর অভিমান আমার সারা শরীর কে আছন্ন করে রেখেছে। উত্তর দিইনি। পরে আরো একটা চিঠি এলো, একই ভাষা শুধু যুক্ত হলো একটা অনুরোধ, ‘তুমি সম্মতি দাও, তাহলে ‘অভিমানিনী’ ছবিটা শেষ করতে পারি’! অনেক ভেবে এবার উত্তর লিখলাম ‘প্রিয় চন্দন, আমার ভালোবাসা নিও, অভিমানিনী আমারও স্বপ্নের ছবি, করতে পারি একটা শর্তে যদি তুমি আমাকে কথা দাও যে তুমি আমাকে, তোমার আমার ভিতরে থাকা সব বন্ধন থেকে মুক্ত করবে’! বন্ধন আমার কাছে এখন সোনার শিকল। মুক্ত আমায় হতেই হবে, নাহলে যে আমার মুক্তি নেই!

প্রত্যাশা মতো পত্র এলো ‘ প্রিয় মঞ্জু, দুজনের স্বপ্নকে পূর্ণ করতে যদি তোমাকে আমাদের মধ্যে থাকা সব সম্পর্কের জাল ছিঁড়ে ফেলতে হয় আমাকে, তাহলে আমি তোমাকে এই কথা দিলাম আজ থেকে তুমি মুক্ত – ইতি তোমার চন্দন’

আশেপাশের আরো কিছু বন্ধুরা এগিয়ে এলো যাতে মঞ্জু আর চন্দনের স্বপ্নের ছবি বাস্তবে রূপ পায় যদিও আমি জানি তারা মনে মনে এই ধারণা পোষণ করে ‘ওদের দুইজনকে এক করতেই হবে’ অদৃশ্য বিধাতা তার জাল বুনে চলে!

প্রায় ভগ্ন শরীর টেনে তুলে অভিমানিনীর কাজ শুরু করলাম। কিছু অংশ আগে করা ছিলো কিন্তু সে সময়ে যে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন তিনি আজ এই জগতে নেই অগত্যা নতুন নায়ক নির্বাচন করে কাজ শুরু হলো।

খুব সুন্দর একটি দৃশ্য ছিলো যার সঙ্গীতও অপূর্ব ‘যেতে যেতে দেখা হয়েছিলো, এক অজানা অতিথি সে /আর আজ যখন ফিরে যাচ্ছি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে সে’

অনেকটাই কসরত চন্দনকে করতে হয়েছিলো, মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ছি, চোখের মুখের ক্লান্তি কোনও মেকআপেই ঢাকা সম্ভব হয়নি। মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিকে আমি এই ছবিটিতে অভিনয় করেছি যা আমার সম্পূর্ণ জীবনে প্রথম, এতে আমি কৃতিত্ব নিতে চাইনা। চন্দনের আর্থিক অবস্থা দেখেই এই সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম। ছবি সম্পূর্ণ হলো। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হলো আর এই শরীরটা রাখা কেনো, অনেক তো হলো অভিনয়!! – এবার ধন্যবাদ জানানোর সময় এগিয়ে আসছে। ছবি মুক্তি পেলো ২৩ শে মার্চ ১৯৬৯। গেলাম দেখলাম ফিরে এলাম ঠিক তার পরদিন থেকে শরীর বাড়াবাড়ির দিকে গেলো, ডাক্তার এলেন সময় নষ্ট না করে ভর্তি করতে বললেন, চলে গেলেন। মালাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম কত টাকা অবশিষ্ট আছে সে উত্তর করলো মাত্র একশো টাকা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘তোমার মনে হয় ওই টাকায় আমার চিকিৎসা হবে?’ এটুকু বলে সংজ্ঞা হারালাম।

বুঝতে পারছি চন্দন সব ব্যবস্থা করেছে, অনুভব করছি বিদেশের সেই ডাক্তারবাবু এসেছেন আর বারবার বলে চলেছেন ‘এর তো এতদিন থাকার কথাই নয় – এটাই তো মিরাক্যাল, এর বেশী কিই বা করতে পারি আমি!!’

দূরে বসে থাকা চন্দনকে একবার খুব ভালোমতো দেখতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু কেউ যেনো আমার কথা কেড়ে নিয়েছে, আমি ঘুমিয়ে পড়ছি – এক অনন্ত ঘুমে।

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী মঞ্জু কুমারী ঘুমিয়ে পড়লেন চিরদিনের জন্যে ‘

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

করোনা আক্রান্ত পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা, আরোগ্য কামনায় পূজার আয়োজন করল তৃণমূল

বিশ্বজিৎ মান্না পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল তৃণমূল কংগ্রেস।...

আইপিএল ২০২০: সম্পূর্ণ সূচি, তারিখ, ভেনু

বহু প্রতিক্ষিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে ভারতের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে আইপিএল। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে...

বাবর আজমকে দিশাহীন মনে হচ্ছে: শোয়েব আখতার

ম্যাঞ্চেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠি দ্বিতীয় টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৬ রানের টার্গেট সহজে পৌঁছে গিয়ে ৫ উইকেটে জয় অর্জন করেছে আয়োজক...

আইপিএল ২০২০: চেন্নাই সুপার কিংসে রায়নার স্থান দখল করতে পারেন ঋতুরাজ গায়কোয়াড়

ইদানিং বেশ কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে চেন্নাই সুপার কিংস। আইপিএল ২০২০ শুরু হওয়ার আগেই স্কোয়াডের মোট ১২ জন সদস্যের কোভিড-১৯ পরীক্ষার...

Recent Comments

error: Content is protected !!