রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১
Home Uncategorized ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের নদীবাঁধ

ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের নদীবাঁধ

৬২৮ Views

রাজু

স্থানীয় গ্রামবাসীরা মাটি এবং পাথর দিয়ে বাঁধ গড়ে তুলেছেন। তার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে কংক্রিটের দীর্ঘ কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবুও সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায় ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো উষ্ণায়নের কারণে প্রতি বছর সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের সবুজ চাদর একটু একটু করে জলের তলায় চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের মতো ভারতীয় সুন্দরবনেও এই প্রবণতা দেখা গিয়েছে।

এর প্রভাব মারাত্মক। জলস্তর বৃদ্ধির ফলে মানুষ এবং বাঘের বাসস্থান ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন ধীরে ধীরে সমুদ্রের গর্ভে চলে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলে ১০২টি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকেই মানুষের বসবাস নেই। সুন্দরবনে গত দুই দশক ধরে গড় ৩ সেন্টিমিটার করে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। এর দরুণ বিশ্বের উপকূলবর্তী এলাকাগুলির মধ্যে দ্রুত হারে ভূমিক্ষয়ের শিকার হওয়া অন্যতম অঞ্চলে পরিণত হয়েছে সুন্দরবন।
শুধু ম্যানগ্রোভ নয়, মানুষের ঘর-বাড়ি জলে তলিয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ত জল কৃষিজ এলাকায় প্রবেশ করে মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে ভিটে-মাটি ছেড়ে সুন্দরবনের বাসিন্দাদের পেটের টানে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। বাঘেদের শিকার ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে। ফলে তারা প্রায়শই মানুষ এবং গৃহপালিত পশুদের আক্রমণ করছে। একই সময়ে গ্রামবাসীরা বাঘেদের অঞ্চলে প্রবেশ করছে। ফলে তাদের বাঘের আক্রমণে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সুন্দরবন হল বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য। এছাড়া এটি একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি লাভ করেছে। সুন্দরবনে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, সুন্দরবন লক্ষ লক্ষ টন কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের দরুণ সুন্দরবন একাধিক চ্যালেঞ্জের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমুদ্রের জলস্তর ক্রমশ বাড়তে থাকায় সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপ উধাও হয়ে যাচ্ছে। জল এবং মৃত্তিকায় লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ম্যানগ্রোভ অরণ্যের স্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়েছে। এছাড়া কৃষিতে ফলন ব্যহত হচ্ছে। মাছ চাষেও এর প্রভাব পড়েছে। মৎসজীবীরা সংকটে পড়েছেন। ঘন ঘন সাইক্লোন এবং বর্ষাকালে খামখেয়ালি বৃষ্টিপাত সুন্দরবনের অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টস (ইউসিএস) কর্তৃক অফার করা ক্লাইমেট হট ম্যাপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতার মতো শহরকে নানা প্রতিকূলতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বাফার জোন হিসেবে কাজ করে। এই অরণ্য গায়েব হল কলকাতার মতো শহরগুলিতে প্রকৃতির রোষের প্রভাব আরও প্রকট হবে।
আর একটি গবেষণা, ‘লিভিং অন দ্য এজ: ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড আনসার্টেনটি ইন ইন্ডিয়ান সুন্দরবন’,-তে উল্লেখ করা হয়েছে এই অঞ্চলটি ব্যাপক জলবায়ুগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জের (যেমন ম্যানগ্রোভ অরণ্য হ্রাস, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধিতে দ্বীপগুলির উপর প্রভা, খামখেয়ালি বৃষ্টিপাত এবং সাইক্লোন) সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুন্দরবনের বাসিন্দাদের মধ্যে অধিকাংশই ভূমিহীন। তারা মূলত কৃষিকাজ এবং মাছ ধরার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। দারিদ্র এবং বঞ্চনার গল্প সুন্দরবনের অলিগলিতে কান পাতলেই শোনা যায়। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সুন্দরবনের পুরুষরা অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। গত কয়েক দশক ধরে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি, ভূমিক্ষয়, বৃষ্টিপাতের প্যাটার্নে পরিবর্তন, উষ্ণতা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র সংকটে পড়েছে। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাও সমস্যায় পড়েছে।


গবেষণায় বলা হয় যে সুন্দরবনে জলবায়ু পরিবর্তনের  প্রভাব দিনকে দিন বাড়ছে। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক ডেটার মাধ্যমে এমনটাই জানা গিয়েছে। তবে এতে বলা হয় যে, এই চ্যালেঞ্জের মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছে।

কৃষি বিজ্ঞানী এবং অসরকারী সংগঠন ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় লবণাক্ততা প্রতিরোধকারী ধানের বীজ পরীক্ষামূলকভাবে সুন্দরবনের মাটিতে চাষ করা হয়েছে। এবং তাতে সুফল পাওয়া গিয়েছে। এটি কৃষকদের আগামীদিনে ব্যাপকভাবে সাহায্য করতে পারে। কৃষির মতো মাছ চাষের ক্ষেত্রেও এই ধরণের পরীক্ষা করা হয়েছে। নোনা জলে যে সমস্ত মাছ থাকতে পারে তা গবেষণা করে দেখা হচ্ছে। আগামীদিনে নোনা জলে মাছ চাষ সুন্দরবনের বাসিন্দাদের কাছে একটি বিকল্প পেশা হয়ে উঠতে পারে। তবে এই বিকল্পগুলি যাতে সুন্দরবনের সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে থাকে সে দিকে নজর রাখতে হবে। কারণ সুন্দরবন মূলত একটি দরিদ্র এলাকা। এই অঞ্চলের বৃহৎ সংখ্যক মানুষ এখনও দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সুন্দরবনে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ফলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত হতে পারে। ‘কম্বাইনড এফেক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সি লেভেল রাইজ প্রোজেক্ট ড্রামাটিক হ্যাবিটাট লস অব দ্য গ্লোবালি-এনডেঞ্জারড বেঙ্গল টাইগার ইন বাংলাদেশ সুন্দরবন’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্রের জলস্তরের ক্রমশ বাড়তে থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দরুণ সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উপর মারাত্মক সমস্যা তৈরি হবে।
একদল বাংলাদেশী এবং অস্ট্রেলীয় গবেষকরা এই গবেষণা পরিচালনা করেন। এই গবেষণার রিপোর্ট সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা কম্পিউটার সিমিউলেশনের সাহায্যে এই অনুমানে পৌঁছেছেন।

ছবি সৌজন্যে – ট্রিপ অ্যাডভাইজর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আবহাওয়ার পূর্বাভাস: আজ বৃষ্টি হতে পারে

কলকাতা ও তার আশেপাশে আজ, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১-এর আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে। বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। অ্যাকুওয়েদার ডট কম...

সাইক্লোনের পর ত্রাণের সাথে সুন্দরবনে ঢুকেছে প্রচুর প্লাস্টিক, সঙ্কটে বাস্তুতন্ত্র

করোনা মহামারি, সাইক্লোনের মতো সমস্যায় এমনিতেই সুন্দরবনের নাজেহাল অবস্থা। তার ওপর সেখানে আবার এক নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সাইক্লোন...

১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে যাচ্ছে সুন্দরবন

সুন্দরবনের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হল পর্যটন। তবে বিগত দু বছরে করোনার জেরে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে পর্যটন ধাক্কা খেয়েছে। মাঝে খোলা হলেও, করোনার...

সুন্দরবনের অন্যতম স্কুল: বরদাপুর আদর্শ মিলন বিদ্যাপীঠ

ইন্দ্রবরদাপুর আদর্শ মিলন বিদ্যাপীঠের পথ চলা শুরু হয় ১৯৬০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রথম দিকে স্কুলটি মাটির দেওয়াল ও টালির চাল দিয়ে তৈরি...

Recent Comments

error: Content is protected !!