বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১
Home District সাহেব ও সাইক্লোন – ফিরে দেখা সুন্দরবনের ইতিহাস

সাহেব ও সাইক্লোন – ফিরে দেখা সুন্দরবনের ইতিহাস

৭১১ Views

অঙ্কিতা পাল

আমফান, নামের বানান ও উচ্চারণ নিয়ে নানা মত থাকলেও এর ধ্বংসলীলা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। এর দাপট কতটা, তা সেদিনের পর এখনও পর্যন্ত হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন বাংলার মানুষ। আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে সুন্দরবনের মানুষজন। কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকাতে হয়ত খাবার জল ও ইলেকট্রিসিটি এসেছে। আবার অনেক জায়গাতে এখনও মানুষ এর দাবিতে বিক্ষোভ দেখিয়া যাচ্ছে। মিডিয়ার হেডলাইনে জায়গা করে নিচ্ছে এসব বিক্ষোভ-অবরোধের খবর। মোবাইলের নেটওয়ার্ক পেতে ছাদের পাঁচিলে উঠে পড়ছে লোকজন। আমপানের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ওপর যে কতটা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু যাঁরা জল বা বিদ্যুতের অভাবে কুঁকড়ে না গিয়ে এখনও লড়ছে? তাঁদের কথা? তাঁদের তো বিদ্যুৎ ও জলের দাবিতে অবরোধ করার রাস্তাটুকুও নেই। কারণ এখনও সেসব জলের তলায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ার স্বপ্ন তাঁরা দেখে না। ত্রাণের দু’মুঠো চিঁড়ে  ভেজানোর জল পেতে তাঁদের চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হয়। হ্যাঁ, সেই সুন্দরবনের মানুষগুলোর কথা বলছি যাঁদের মাথার ছাদটুকুও এই ঝড়ে উড়ে গিয়েছে। আসলে, ঝড় তাঁদের নিয়মিত অতিথি। বুলবুলের ছোবল কলকাতা শহর টের পায়নি এই সুন্দরবনের জন্যই। সেই বলিদানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরও একটি ঝড়ে বিধ্বস্ত সুন্দরবন।

এই সুন্দরবন, ম্যানগ্রোভ অরণ্য বহু ঝড়ের সাক্ষী। এখানকার মানুষজন প্রতিবার ঝড়ের পর নতুন করে সংসার বাঁধে। যদিও তাঁরা এটা জানেন যে পরবর্তীতে আরও একটা ঝড় এসে সেটাও তছনছ করে দেবে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের হিসাব অনুযায়ী এই সুন্দরবনে প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষের বসবাস। কিন্তু এরকম প্রতিকূল পরিবেশে কেন বসবাস করেন তাঁরা? তাঁরা এখানে আসলেনই বা কীভাবে? এবং এই অরণ্যে কীভাবে জীবনযাপন শুরু করলেন? আসুন একটু ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক।

সুন্দরবন এলাকায় প্রথম বসতি স্থাপন শুরু ইংরেজ আমলে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকে এর সূত্রপাত। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমেই ইংরেজরা উচ্চ হারে জমিদারদের উপর কর ধার্য করে। তবে সেই করের হার ছিল স্থবির। কর দিয়ে যেটুকু ফসল থাকত তা জমিদারদের বা কৃষকদের ভাগে থেকে যেত। এই কর ব্যবস্থা শুরুর পর আশা করা হয়, কৃষিকাজে আরও বেশি উৎসাহ লাভ করবে কৃষকরা। কৃষকদের অবস্থার উন্নতি হবে, দুর্ভিক্ষ কেটে যাবে। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জেরে কোম্পানির আয়ে ঘাটতি দেখা দেয়, কারণ এই কর ব্যবস্থায় আয় বৃদ্ধির কোনও উপায় ছিল না। আয় বৃদ্ধির উপায় হিসেবে কোম্পানি এই সুন্দরবনের ঘন অরণ্যে কৃষিকাজ শুরু করার কথা ভাবে। অবশ্য, এর একশ বছর আগেই ঔরঙ্গজেবের জমানায় (১৬৫৮-১৭০৭) পূর্ববঙ্গে কৃষিকাজের বিস্তার শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে সেই সময়, মুঘলদের কাছে এই অরণ্য দুর্ভেদ্য মনে হয়েছিল। তখন, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো দাঁড়িয়েছিল বুনন শিল্পের উপর।

কিন্তু ব্রিটিশরা ইংল্যান্ডে ভারতীয় বস্ত্রের আমদানির উপর ৭৫ শতাংশ কর ধার্য করে। এর জেরে বিলেতে ভারতীয় বস্ত্রের বাজার পড়ে যায়। শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে সস্তার বিদেশি বস্ত্রে ভারতীয় বাজার ছেয়ে যায়। নিজের দেশের বাজারে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হার মানতে বাধ্য হয় ভারতীয় বস্ত্র।

বুনন শিল্প ছাড়াও মুঘল যুগে এই অঞ্চলের আরও একটি অন্যতম শিল্প ছিল লবণ তৈরি। কিন্তু ইংরেজদের নজর থেকে বাঁচানো যায়নি এই শিল্পকেও। লবণ শিল্পের বাজারে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৩০ এর শুরুর দিকে ব্রিটিশদের তৈরি লবণ ভারতীয় বাজারে আসতে শুরু করে। এইদিকে ভারতীয়দের তৈরি লবণের উপর ৬৫০ শতাংশ কর বসানো হয়। ব্রিটিশদের তৈরি কম দামি লবণের কাছে স্তব্ধ হয়ে যায় এই ব-দ্বীপ অঞ্চলের লবণ শিল্প।

এইভাবে ধীরে ধীরে এই এলাকা থেকে আয় কমে আসায় কোম্পানি সুন্দরবনের গাছ কেটে তা চাষজমি বানানোর পরিকল্পনা নেয়। সুন্দরবনের তৎকালীন কমিশনার উইলিয়াম ড্যাম্পিয়ারের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৮৩০ সালের মধ্যে, শুধুমাত্র সুন্দরবনের মেঘনা মোহনার বাকারগঞ্জ এলাকাতেই ৮৫,০০০ একর জায়গার গাছ কাটা হয়। একসময় যেখানে লবণ উৎপাদন হত এখন সেই এলাকাতেও চাষাবাদের কাজ শুরু করা হয়। শিল্পের অবনতির পর যাঁরা বেকার ছিলেন, তাঁরা চাষাবাদের আশায় মেঘনা নদীর মোহনায় (এখন বাংলাদেশে) বসতি স্থাপন শুরু করেন। সুন্দরবনে মাতলা নদীর ওপরে বন্দর তৈরি করতে গিয়েও ৮,৬৫০ একর জমি পরিষ্কার করা হয়। ১৮৬২ সালে বন্দর তৈরি হয় এবং ভারতের তখনকার গভর্নর জেনারেলের নামে এর নামকরণ হয়, পোর্ট ক্যানিং। কিন্তু এই বন্দরের পরিকল্পনার সময়ই গভর্নরের উদ্দেশে খোলা চিঠি লেখেন সেই সময়ের সাইক্লোন এক্সপার্ট হেনরি। চিঠিতে তিনি সুন্দরবনে নগর পত্তনের বিষয়ে সতর্ক করেন লর্ড ক্যানিংকে। তিনি জানান ওই জায়গায় বন্দর স্থাপন সুরক্ষিত নয়। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন সাইক্লোনের ভয়াবহতা। যদিও তাঁর সতর্কবাণী উপেক্ষা করেই ক্যানিং বন্দর স্থাপন হয়।

১৮৬৭ সালের ১ নভেম্বরের রাত হেনরির সেই সতর্কবার্তার কথা মনে করিয়ে দেয়। দ্য ইংলিশম্যান খবরের কাগজে রিপোর্ট বের হয়, “৬ ফুট উচ্চতার এক জলোচ্ছ্বাস নদী তীরের জেটির একটি অংশ ভেঙে নিয়ে যায়। এছাড়া রেললাইনের ক্ষতি হয় এবং ধ্বংস হয়ে যায় স্টেশন।” ১৮৬৭-৬৮ সালের সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই ঝড়ের চোখ ক্যানিং বন্দরের ওপর দিয়েই বয়ে গিয়েছিল। ৯০ জন মানুষ ও ৫০০ গবাদি পশু প্রাণ হারিয়েছিল। পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছিল, কারণ কুয়ো সহ পানীয় জলের সব আধারে সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে গিয়েছিল। বন্দর ও সেই শহর এক অন্তঃসারশূণ্য এক কঙ্কালে পরিণত হয়েছিল।

বেনজামিন কিংসবারির লেখা ‘অ্যান ইমপেরিয়াল ডিজাস্টার’ বই থেকে জানা যায়, এর ঠিক ৯ বছর পর, ১৮৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর আরও একটি ঝড় এসে আছড়ে পড়ে মেঘনা নদীর মোহনায়। ২,১৫,০০০ জন প্রাণ হারিয়েছিল সেই ঝড়ে। দুর্ভিক্ষ ও কলেরায় প্রাণ গিয়েছিল আরও ১ লক্ষ মানুষের।

এরপর ১৯১০ সালে একজন স্কটিশ ব্যবসায়ী ৯০০০ একর জমি পরিষ্কার করে গোসাবাতে জমিদারি ও কো-অপারেটিভ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বাংলার জনসংখ্যার একটা বড় অংশ সুন্দরবনে আসে বলে জানা যায়। খিদের জ্বালায় তাড়িত হয়ে মেদিনীপুরের একটা অংশ সুন্দরবনে এসে বসতি স্থাপন করে। তারা জানত এইখানে মাছ ধরে অন্তত জীবিকা নির্বাহ করা যাবে।

গত কয়েক বছরে আয়লা, বুলবুল আর এবারের আমফান; কত ঘূর্ণিঝড়ের সাক্ষী হয়ে থেকেছে এই সুন্দরবন। বাফার জোন হওয়ায় ঝড়ের প্রকোপ কমিয়েছে প্রতিবার। এবারের ঘূর্ণিঝড়, আমফানে ক্ষতি হয়েছে অসংখ্য গাছের। লবণাক্ত জলে হলুদ হয়েছে গাছের পাতা। ফিকে হয়ে গিয়েছে মাছ ধরা মানুষগুলোর জীবন। মরা মাছ হাতে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করার দিন গুনছেন তাঁরা। তবে এখনও তাঁরা আঁধারে। কিন্তু আশা করতে তাঁরা ভোলেননি। তাঁরা এখনও স্বপ্ন দেখেন, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁরা বাস্তববাদী। তাই তাঁদের ভয়ও হয়। সব ঠিক হওয়ার আগেই যদি আরও একটা ঘূর্ণিঝড় এসে সব তছনছ করে দিয়ে যায়?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

স্যামসনের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং, তবুও শেষ হাসি হাসল পাঞ্জাব

স্কোরবোর্ড বলছে, আইপিএল ২০২১-এর চতুর্থ ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ রানে হারিয়ে দিয়েছে পাঞ্জাব কিংস। তবে সেটা দেখে ম্যাচের আসল ছবি বোঝা যাবে...

ধর্নায় বসবেন মমতা

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রচারের উপর 24 ঘন্টার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই...

মানুষ মরে এভাবেই, কেউ খোঁজ রাখে না

বিশ্বজিৎ মান্না ধরুন আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে, বাজারের থলে হাতে নিয়ে বেরোলেন। আপনার বাড়ির লোক বা আপনি কী...

ফের ক্ষমতায় দিদি, তবে বিজেপির আসন বাড়বে: বলছে সমীক্ষা

বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম বিরোধী দল হিসাবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেন্দ্রের শাসক দলের দাবি, রাজ্যে এবার তারাই ক্ষমতায় আসতে চলেছে।...

Recent Comments

error: Content is protected !!