বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০২০
Home village এখনও পর্যটন মানচিত্রের বাইরে রয়েছে পাথরপ্রতিমা

এখনও পর্যটন মানচিত্রের বাইরে রয়েছে পাথরপ্রতিমা

১৫১ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

সুন্দরবন মানেই বাঘ। এই ধারণা অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে। কিন্তু যারা সুন্দরবনে থাকেন, সুন্দরবনে সারা জীবন কাটিয়েছেন, তারা জানেন যে সুন্দরবনের সর্বত্র বাঘ দেখা যায় না। হয়তো কয়েক দশক আগে সেখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আনাগোনা ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জনবসতি গড়ে তোলার তাগিদে বেআইনীভাবে জঙ্গল কাটা হয়েছে। তাই সুন্দরবনের অনেক এলাকা আছে, যেখানে বিগত ২০ বছরে বা তার অধিক সময়েও কোনো বাঘ দেখা যায় নি। অতীতের কোনো সময়ে হয়তো সেখানে বাঘ ছিল।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনের এই সমুদ্র সৈকত গোয়াকেও হার মানাতে পারে

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হওয়ায় বিশ্ববাসীর কাছে সুন্দরবন মানেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু ঘটনা হল, বাঘ ছাড়াও সুন্দরবনে আরও নানা আকর্ষণ রয়েছে। সুন্দরবনে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি দেখা যায়। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র দেখে অবাক হতে হয়। অর্থাৎ সুন্দরবনে ঘুরতে গেলে শুধু মাত্র রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখার প্রত্যাশা না নিয়ে যাওয়াই ভালো। এতে যে সুবিধা রয়েছে তা হল, সুন্দরবনের অনেক এলাকা পর্যটনের আওতায় চলে আসবে।

সুন্দরবনের জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পটগুলি হল ব্যাঘ্র প্রকল্প, পখিরালয়, সাগরদ্বীপে কপিল মুনির আশ্রম, প্রত্যেক বছরের গঙ্গাসাগর মেলা। এছাড়া রয়েছে বকখালি, হেনরি আইল্যান্ডের মতো জায়গা, যেখানে প্রায় সারা বছর ধরেই কমবেশি পর্যটকদের আগমন হয়। তবে এর বাইরেও সুন্দরবনে অনেক স্থান রয়েছে, যেগুলি প্রচারের অভাবে পর্যটন মানচিত্রে আসতে পারেনি। যেমন উদাহরণ হিসেবে কাকদ্বীপ মহকুমার পাথরপ্রতিমা ব্লকের কথা বলা যায়।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে স্কুলছুট পড়ুয়ার সংখ্যা বেশ উদবেগজনক

সুন্দরবনের আর পাঁচটা এলাকার মতো পাথরপ্রতিমা। তবে পর্যটনের সমস্ত উপাদান এখানে মজুত রয়েছে। পরিকাঠামোর কিছুটা অভাব রয়েছে ঠিকই, তবে সময়ের সাথে সাথে যোগাযোগের অনেক উন্নতি হয়েছে। তাই দেশ-বিদেশের পর্যটকরা চাইলে কলকাতা থেকে সড়কপথে সোজা পৌঁছে যেতে পারেন সুন্দরবনের এই এলাকায়। একটা সময় ছিল কলকাতা যাওয়ার জন্য পাথরপ্রতিমার বাসিন্দাদের খেয়া পেরিয়ে রামগঙ্গায় যেতে হত। কিংবা গঙ্গাধরপুর হয়ে কাকদ্বীপ থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা যেতে হত। গঙ্গাধরপুরেও নদী পেরোতে হত। তবে সেখানে নদীর গভীরতা কম থাকায় অনেক সময় চড়ায় নৌকা আটকে যেত। ভাটার সময় জলের স্তর এতটাই নিচে নেমে যেত যে ঘাট পর্যন্ত নৌকা যেতে পারত না। তাই যাত্রীদের পাঁকে নেমে নৌকায় উঠতে হত। সুন্দরবনের এই এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, গঙ্গাধরপুরে সেতু নির্মাণ করতে হবে, যাতে কাকদ্বীপের সাথে সড়কপথে যোগাযোগ তৈরি হয়। সুন্দরবনবাসীর সেই স্বপ্ন বহুদিন আগেই পূরণ হয়েছে।
আরও পড়ুন: উষ্ণায়নের ফলে ডুববে মুম্বই, আন্তর্জাতিক গবেষণায় ব্রাত্য সুন্দরবন

পাথরপ্রতিমা বাজার থেকে এখন কলকাতা, নূরপুর, ডায়মন্ডহারবার, হাওড়া বাসে করে যাওয়া যায়। পাথরপ্রতিমা বাজারে বেশ কিছু হোটেলও তৈরি হয়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে সব কিছুর উন্নতি হলেও পর্যটনের মানচিত্রে সেভাবে স্থান করে নিতে পারেনি পাথরপ্রতিমা। সুন্দরবনের এই এলাকায় দেখার মতো অনেক জায়গা রয়েছে। প্রথমেই বলতে হল ভাগবতপুর কুমির প্রকল্পের কথা। এটি রাজ্যের একমাত্র কুমির প্রকল্প, যা তৈরি হয়েছিল সত্তরের দশের মাঝামাঝি। এখনও দর্শকদের কাছে আকর্ষণ ধরে রেখেছে ভাগবতপুর কুমির প্রকল্প। কাকদ্বীপ পেরিয়ে গঙ্গাধরপুর ব্রিজ হয়ে সড়কপথে সোজা পৌঁছে যাওয়া যায় ম্যানগ্রোভ অরণ্যে ঘেরা এই স্থানে। কিশোরী নগরে সেতু নির্মাণে বিলম্বের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সড়কপথে এই কুমির প্রকল্পে চার চাকা গাড়ি নিয়ে যাওয়া যেত না। তবে এখন আর সেই সমস্যা নেই। যাতায়াতের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বাকি পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। কুমির প্রকল্পের আশেপাশে ভাতের হোটেল নেই। সামান্য দূরে একটি রেস্তোরাঁ কাম বার রয়েছে। তবে সেখানে নানা অবৈধ কাজকর্ম হয় বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। ফলে পরিবার নিয়ে সেখানে থাকা ঝুঁকিসাপেক্ষ ব্যাপার। কুমীর প্রকল্পে যাওয়ার পাশাপাশি এখানে সুলভে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এখন সেই অর্থে কোনো ডেডিকেটেড নৌকা সার্ভিস নেই যাতে করে কিছুক্ষণের জন্য নৌকা ভ্রমণ করা যেতে পারে। ফলে অনেক সময় যাত্রী পরিবহণকারী ফেরি সার্ভিসের নৌকা বুক করেন পর্যটকরা। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে, এই সমস্ত নৌকায় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: পাথরপ্রতিমা ফরেস্ট জেটিঘাটের বেহাল অবস্থা

এক্ষেত্রে হোমস্টে চালু করা যেতে পারে। হোমস্টে চালু হলে ভাগবতপুর কুমির প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পর্যটন হাব গড়ে উঠতে পারে। পাথরপ্রতিমার আর একটি আকর্ষণীয় স্থান হল রাক্ষসখালি নদীর পাড়। নদীর একদিকের পাড় ক্রমশ ভাঙছে। এই ভাঙনের সমস্যা মেটাতে পারলে, এই স্থানটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। নদীর পাড় বরাবর পাকা বাঁধ নির্মাণ করলে ভাঙনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। ক্যাফে বা স্ন্যাক্সের ব্যবস্থা বা পার্ক নির্মাণ করলে সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়ার সময় পর্যটকরা এখানে ঢুঁ মারতে পারেন।

এছাড়া পাথরপ্রতিমায় ভিলেজ টুরিজমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সুন্দরবনে আগত পর্যটকরা গ্রামের নানা হস্তশিল্পের জিনিস বা হ্যান্ডক্রাফট দেখতে পারেন। চাইলে তারা সেগুলি ক্রয় করতেও পারেন। এর মাধ্যমে হ্যান্ডক্রাফটের পাশাপাশি মধু সহ সুন্দরবনের অন্যান্য কৃষিজাত প্রোডাক্ট তাদের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে ৩০ কোটি ভারতীয়কে কোভিড-১৯ টিকা প্রদানের পরিকল্পনা

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন আজ বলেছেন যে ২০২১ সালের আগস্টের মধ্যে ৩০ কোটি ভারতীয়কে কোভিড-১৯ প্রতিরোধের টিকা প্রদান করা হবে। এমনই পরিকল্পনা...

ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সম্বন্ধে ১১টি তথ্য

ম্যানগ্রোভ অরণ্য শুধু সুন্দরবনই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলেও দেখা যায়। তবে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ হল বিশ্বের বৃহত্তম। যে পরিবেশে ম্যানগ্রোভ বেড়ে...

নির্বিচারে ম্যানগ্রোভ নিধনে বিপদের মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র

আইন রয়েছে। রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তা সত্ত্বেও সুন্দরবনে নির্বিচারে চলছে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসলীলা। প্রশাসনের তৎপরতায় মাঝে মাঝে অভিযান চলে। থেমে যায় বেআইনী কারবার। কিন্তু...

মটন বিরিয়ানি থেকে লুচি-ছোলার ডাল, কলকাতার খাবারে মুগ্ধ হয়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনা!

শুধু করোনার তাণ্ডবই নয়, নানা কারণে ২০২০ একটি ‘আনলাকি’ বছর হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। এমনটাই দাবি অনেকের। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে...

Recent Comments

error: Content is protected !!