বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০
Home country কালের গর্ভ হতে জেগে ওঠো হে মহানায়ক

কালের গর্ভ হতে জেগে ওঠো হে মহানায়ক

২২৮ Views

সাগ্নিক চৌধুরী

(অনুবাদক এবং সাংবাদিক)

“অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ

ওম মৃত্যর্মা অমৃতমঃ গময়ঃ শান্তি শান্তি ওম

শান্তি ওম, শান্তি ওম, হরি ওম তদসদ,

শান্তি ওম, শান্তি ওম, হরি ওম তদসদ।”

ছোটবেলা থেকেই ডায়েরি লেখার শখ্ ছিল। সেই শখ্ যে কবে অভ্যেসে পরিণত হল বুঝতেই পারিনি। কল্পনার জগতে ভেসে অনেক কিছু ভাবনা মাথায় ঘুরত, তার মধ্যে একটা ছিল সেই দেশনায়কের সঙ্গে দেখা করা। যার কথা, লেখা এবং সর্বোপরি ভাবনা ভীষণভাবে আমাকে অনুপ্রাণিত করত। তাই ২৩শে জানুয়ারি মানেই আমার কাছে সেই লোকের মুখে মুখে ফেরা প্রত্যাশায় ধোঁয়া দিয়ে যাওয়া একটি দিন। যদি তিনি ফিরে আসেন একবার, তাহলে হয়তো সব কিছুকে অন্যরকম করে ভাবতে শেখাবেন। কিন্তু দিন যায়, রাত আসে, সেই ছোটোবেলার ডায়েরির পাতা হলুদ হয়ে যায়। তবুও তিনি থেকে যান সব কিছুর অন্তরালে, এক প্রছন্ন নায়ক হয়ে। কর্ম উজ্জাপন করেও তিনি ফলত্যাগ করে আদর্শকে রেখে গেছেন উজ্জ্বল করে। বাংলা সাহিত্য এবং গবেষকের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছেন তিনি। তার এক দিল্লি চল ডাকে ইংরেজ সরকারের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। আজ সেই মহান পুরুষের জন্মদিনে শত কোটি প্রণাম।

আশা করি এতক্ষণের এই আলোচনার মধ্যে আপনি আন্দাজ করে ফেলেছেন, এত বিশেষণ কার জন্য। আর যদি আপনি বুঝতে না পারেন, তাহলে আমার কিছু করার নেই। সবাই এই ভদ্রলোকটির কাজের থেকে বেশি মৃত্যু নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু জীবিত অবস্থায় ওনার কাজ, অবদান এবং ভাবনা নিয়ে আপনাদের তেমন কোনও মাথা ব্যথা যে নেই তা বলাই বাহুল্য। সেই ১৯৪৫ সালের তাইহোকু বিমান বন্দরে আসলে কী হয়েছিল, সেই পুরনো কাসন্দির পুরোটাই রটানো ঘটনা, নাকি ঘটানো রটনা, সেই তর্ক বিতর্ক বা আলোচনা করার মতন জ্ঞান বা ইচ্ছে আমার নেই।

আমি এই সবের বাইরে এসে অন্য একটি বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই, সেটা আপনি কীভাবে নেবেন সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আসলে আমার কাছে নেতাজি হলেন এমন একটা অনুভূতি, যা সব কিছুর মধ্যে থেকেও নিজেকে চিনতে বা জানতে শেখায়। এমন একটা ভাবনা যা শত শত মানুষকে একই সূত্রে বেঁধে ফেলে। তার মানবিক সত্ত্বার বাইরে এসে তিনি এমন একটা ভাবনার উন্মেষ ঘটান, যা পড়ে পড়ে মার খাওয়ার বদলে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। যদিও সমাজ আমাদের শিখিয়ে এসেছে কোনও সমস্যার সমাধান না করতে পারলে, তার সাথে আপোষ করতে। কিন্তু “নেতাজি” হলেন এমন একটা অনুভূতি যা মানিয়ে নেওয়ার বদলে মানসিকতার বদল ঘটায়। দেশ মানে কী শুধুই মাটি, জল, বায়ু, নাকি একটা ভাবনা, যার বীজ মাটি থেকে আদর্শের চারা গাছ হয়ে জন্ম নেয়। ধর্ম সহিষ্ণুতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জাত-পাত ধর্মের সংকীর্ণতার বাইরে এসে দশের জন্য প্রাণপাত করতে শেখায়। কুশিক্ষার নিকশ অন্ধকারে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালায়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস একটা এমন ভাবনা যা অর্থ, ধনসম্পদের বাইরে এসে আমাদের শেখায় লোভ আর চাহিদা তো থাকবেই, কিন্তু সেটিকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে শুধু নিজের নয় সার্বিক কল্যাণ হয়।

কলকাতার শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে নেতাজির মূর্তি। ছবি সৌজন্যে ইন্টারনেট।

এবার আপনি হয়তো ভাবছেন কী সব ভাবুক মার্কা কথাবার্তা, যার মাথা নেই, মুণ্ডু নেই বলে চলেছি আমি। আসলে এই ভদ্রলোকের কর্মকান্ড এতটাই বিশাল যে সাধারণ চড়ুইপাখির মাথায় ঢোকানো একটু চাপের। কারণ নেতাজি ছিলেন একজন মেধাবী এবং তার সমাজবোধ অন্যদের থেকে অনন্য। বলা হয় ১৯৪৪ থেকে ৪৫ তিনি যে মানের রাজনীতি করেছেন তার প্রভাব যে শুধুমাত্র দেশের গন্ডিতে নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যা প্রভাব ফেলেছে তা আজও উচ্চ গবেষণার বিষয়। আসলে এখানে একটু বলে রাখা দরকার, আমাদের “ইতিহাসের বই” নেতাজিকে যেভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, সত্যিটা যে তার থেকে বহুগুণ আলাদা তা বলাই বাহুল্য। নেহরু আর গান্ধীজির রাজনৈতিক অবদানকে মহৎ প্রমাণ করতে গিয়ে নেতাজির মান অনেক ক্ষেত্রে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। রাজনীতির অলিন্দে আটকে পড়া এবং পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো একজন নেতার সত্ত্বা, আড়ালে আবডালে আসল নেতাজিকে ঢাকা দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা করা হলেও, হীরার গুরুত্ব কিন্তু জহুরী ঠিক খুঁজে নেয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও ওনার গোপন নথি প্রকাশ পাবে কিনা তাতে কত লোকের পাকা ধানে মই পড়বে, সেই নিয়ে রাজনীতি হয়েই চলেছে। কিন্তু তার আদর্শ এবং সমাজকে নতুনভাবে দেখার অনুপ্রেরণা নিয়ে একটু ভাবুন।

শেষ করব একটাই কথা বলে। অফিসকাছারিতে, আদালতে নেতাজি আজ একটা ছবি হয়ে লটকে আছেন দেওয়ালে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে রোদ, জল, বৃষ্টি ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তি, শুধু পাথর, বালি, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি। তিনি আজও আমাদের এক অতন্দ্রপ্রহরী। প্রবল কষ্ট এবং যন্ত্রণার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক উজ্জ্বল দলিল। এর পর থেকে যখনই আপনি শ্যামবাজারে যাবেন, আর ঘোড়ার পিঠে বসা সেই প্রবাদপ্রতিম পুরুষের দিকে চোখ রাখবেন, নিজের আত্মসত্ত্বাকে একবার খুঁজে দেখার চেষ্টা করবেন, যা আর কিছু করুক বা না করুক নিজেকে অবশ্যই জানতে এবং চিনতে শেখাবে।

লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। এর জন্য দৈনিক সুন্দরবন কোনোভাবেই দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মধু এনেও উপযুক্ত দাম পান না সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীরা

আলামিন ফকির। বয়স বছর কুড়ি। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দা। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করার জন্য পাস জোগাড় করতে হয়। সেই জন্য স্থানীয় এক...

এক ওভারে পাঁচ ছক্কা: আইপিএল ২০২০-তে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন রাহুল তেওয়াটিয়া

রবিবার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) একটি ম্যাচে শার্জায় মুখোমুখি হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস এবং কিংস ইলেভন পাঞ্জাব। এই ম্যাচে ব্যাটিং দক্ষতার মাধ্যমে চাঞ্চল্য...

করোনা আক্রান্ত পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা, আরোগ্য কামনায় পূজার আয়োজন করল তৃণমূল

বিশ্বজিৎ মান্না পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল তৃণমূল কংগ্রেস।...

আইপিএল ২০২০: সম্পূর্ণ সূচি, তারিখ, ভেনু

বহু প্রতিক্ষিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে ভারতের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে আইপিএল। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে...

Recent Comments

error: Content is protected !!