শনিবার, অক্টোবর ১৬, ২০২১
Home ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন বাঁচাতে আরও বেশি ম্যানগ্রোভ চাই

সুন্দরবন বাঁচাতে আরও বেশি ম্যানগ্রোভ চাই

১৯৯ Views

সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলি সাইক্লোনের মুখোমুখি হয়েছে সুন্দরবন। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং উল্লেখযোগ্যগুলি হল ইয়াস, অম্ফান, বুলবুল এবং আয়লা। এগুলি সুপার সাইক্লোন নামেও পরিচিত। এই সাইক্লোনগুলির ফলে সুন্দরবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছেন।

সুন্দরবনে সাইক্লোন কোনও নতুন ঘটনা নয়। এর আগেও বহুবার এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা গেছে। তবে গত কয়েক বছরে সাইক্লোনের সংখ্যা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হল জলবায়ু পরিবর্তন। শুধু সুন্দরবনই নয়, বিশ্বের সমস্ত উপকূলবর্তী অঞ্চল, যার উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে কম, সেখানেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের কিছু বদ্বীপ এর মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে জলের তলায়। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই আশঙ্কাবার্তা শুনিয়েছেন। তাদের অনুমান, বর্তমান হারে সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে থাকলে, কয়েক দশকের মধ্যে সুন্দরবনের কিছু দ্বীপ সম্পূর্ণভাবে জলের তলায় চলে যেতে পারে। তাতে যে শুধু মানুষই সমস্যায় পড়বে তা নয়, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের গর্ব, তারাও চরম সঙ্কটে রয়েছে। এই বিপদ থেকে বাঁচার উপায় কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের হাত থেকে বাঁচাতে পারে ম্যানগ্রোভ অরণ্য। সাইক্লোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে প্রাচীরের মতো ভূমিকা পালন করে ম্যানগ্রোভ। নোনা জলেও এই গাছের বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে, সুন্দরবনজুড়ে ম্যানগ্রোভের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে।

সুন্দরবনের মতো বিশ্বের অনেক উপকূলবর্তী এলাকাতেও ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট দেখা যায়। যেমন ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে রয়েছে ম্যানগ্রোভ। তবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য রয়েছে সুন্দরবনে, যার ৬০ শতাংশ রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি ৪০ শতাংশ রয়েছে ভারতে। সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় সুন্দরবনে এখন ৯৬টি বাঘ আছে।

সুন্দরবনে অরণ্য সংরক্ষণের উদ্যোগের ইতিহাস বেশ পুরানো। মুঘল আমল (১৫২৬-১৭৬৫) থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের (১৭৬৫-১৯৪৭) সময় পর্যন্তও এর নিদর্শন রয়েছে। সুন্দরবনে এক সময় ম্যানগ্রোভের অভাব ছিল না। তবে সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বসতি স্থাপনের প্রয়োজন হয়। আর তার জেরেই প্রথম কোপ পড়ে ম্যানগ্রোভে। শুধু তাই নয়, কৃষিকাজের প্রয়োজনেও ম্যানগ্রোভ নিধন হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সুন্দরবনের এই মূল্যবান ম্যানগ্রোফ ফরেস্ট বাঁচাতে নানা আইন তৈরি করা হয়েছে। ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে সুন্দরবনকে টাইগার রিজার্ভের তকমা দেওয়া হয়। সুন্দরবনের ১,৭০০ বর্গ কিলোমিটার কোর এরিয়াকে ১৯৮৪ সালের ৪ মে তারিখে ন্যাশনাল পার্ক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৮৭ সালে সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের তকমা দেওয়া হয় সরকারের তরফ থেকে। ২০১৯ সালে সুন্দরবন হয়ে ওঠে ভারতের বৃহত্তম ওয়েটল্যান্ড সাইট।

১৯০৩ সাল নাগাদ গোসাবা কোঅপারেটিভ মডেল তৈরি করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন। ঔপনিবেশিক আমল থেকে সুন্দরবনে মানুষের বাসস্থান তৈরির কাজ গতি পায়। তখন থেকে ম্যানগ্রোভ নিধনের কাজ ধীরে ধীরে শুরু হয়। সুন্দরবনের ১০২টি দ্বীপের মধ্যে বর্তমানে ৫৪টি দ্বীপে মানুষ বসবাস করে। দ্বীপগুলিতে এখনও ম্যানগ্রোভ রয়েছে, তবে আগের চেয়ে ঘনত্ব কমেছে। ম্যানগ্রোভ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের এই দ্বীপগুলি আরও বন্যা প্রবণ হয়ে পড়েছে। আয়লা বা আম্ফানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মারাত্মক হয়েছে। ম্যানগ্রোভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের নদীবাঁধের মাটি আলগা হয়েছে। নদীবাঁধ দুর্বল হয়েছে। ভাঙনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমিক্ষয় বর্তমানে একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সাইক্লোনগুলিতে সুন্দরবনের এই দুর্বল নদীবাঁধাগুলি ছাপিয়ে লোকালয়ে জল ঢুকেছে। কোনও কোনও মহল থেকে কংক্রিটের নদীবাঁধ তৈরির দাবি উঠছে। তবে সেটা বাস্তবায়িত করা কঠিন। প্রথমত, কংক্রিটের নদীবাঁধ নির্মাণ যথেষ্ট খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার। তাছাড়া এটি কোনও স্থায়ী সমাধান হবে বলে জোর দিয়ে বলা যায় না। কংক্রিটের নদীবাঁধ পরিবেশ বান্ধব কোনও সমাধান হতে পারে না। কংক্রিটের নদীবাঁধ তৈরি করা হলেও তা ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করতে পারবে না। কংক্রিটের নদীবাঁধের নিচে থাকা মাটি ক্ষয়ে গেলে সেই বাঁধ আর মজবুত থাকবে না। সুন্দরবনের নদীর জলে ভেসে বেড়ানো ম্যানগ্রোভের বীজ কংক্রিটের বাঁধের গায়ে শিকড় প্রবেশ করাতে পারবে না। তাই ম্যানগ্রোভ গড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।

সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের পরিমাণ বাড়ানো। একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, প্রতি ১০০ বর্গ মিটারে ৩০টি ম্যানগ্রোভ থাকলে তা সুনামির ঢেউ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে। ২০১৯ সালে সুন্দরবনে যখন সাইক্লোন বুলবুল আছড়ে পড়েছিল, তখন ম্যানগ্রোভের সৌজন্যে হাওয়ার গতি হ্রাস পেয়ে হয়েছিল ঘন্টায় ২০ কিলোমিটার। শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, ম্যানগ্রোভের সাথে সুন্দরবনের অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। ম্যানগ্রোভের পরিমাণ বাড়লে মাছ ধরার পরিমাণ বাড়বে। কারণ ম্যানগ্রোভের শিকড় অনেক মাছের ব্রিডিং গ্রাউন্ড হয়ে ওঠে। সেখানে অনেক মাছও ধরা যায়। কাঁকড়া এবং চিংড়ি ম্যানগ্রোভের শিকড়ের আশেপাশেই সাধারণত থাকে। সামগ্রিকভাবে, সুন্দরবনের সুরক্ষা থেকে অর্থনীতি, সবেতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ম্যানগ্রোভ অরণ্য। ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ এবং এর ঘনত্ব বৃদ্ধির কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই কাজ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সুন্দরবন রক্ষা পাবে। শুধু সুন্দরবন নয়, রক্ষা পাবে আশেপাশে থাকা কলকাতার মতো শহরাঞ্চল, যাদের ওপর ঝড়ের প্রথম ইমপ্যাক্ট পড়ে না সুন্দরবনের জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আবহাওয়ার পূর্বাভাস: আজ বৃষ্টি হতে পারে

কলকাতা ও তার আশেপাশে আজ, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১-এর আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আকাশ মূলত মেঘলা থাকবে। বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। অ্যাকুওয়েদার ডট কম...

সাইক্লোনের পর ত্রাণের সাথে সুন্দরবনে ঢুকেছে প্রচুর প্লাস্টিক, সঙ্কটে বাস্তুতন্ত্র

করোনা মহামারি, সাইক্লোনের মতো সমস্যায় এমনিতেই সুন্দরবনের নাজেহাল অবস্থা। তার ওপর সেখানে আবার এক নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। সাইক্লোন...

১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে যাচ্ছে সুন্দরবন

সুন্দরবনের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হল পর্যটন। তবে বিগত দু বছরে করোনার জেরে বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে পর্যটন ধাক্কা খেয়েছে। মাঝে খোলা হলেও, করোনার...

সুন্দরবনের অন্যতম স্কুল: বরদাপুর আদর্শ মিলন বিদ্যাপীঠ

ইন্দ্রবরদাপুর আদর্শ মিলন বিদ্যাপীঠের পথ চলা শুরু হয় ১৯৬০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রথম দিকে স্কুলটি মাটির দেওয়াল ও টালির চাল দিয়ে তৈরি...

Recent Comments

error: Content is protected !!