সোমবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২১
Home feature তিলোত্তমার জীবনরেখা

তিলোত্তমার জীবনরেখা

২৩২ Views

মিতুন মণ্ডল

দৃশ্য– ১

শহরে সবে শীতের ছোঁয়া। সাত সকালের চাঁদনির ফুটপাত। ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাড়ে চুমুক দিয়েছেন পাঁচ মর্নিং ওয়াকার। মল্লিকঘাটের ফুলের বাজারে সবে শুরু হয়েছে বিকিকিনি। গঙ্গার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত সবই অস্পষ্ট ঘন কুয়াশায়। বাবু ঘাট থেকে ঠাওর করা যায়, হাওড়া স্টেশনের বিল্ডিংয়ের জ্বলজ্বল করছে লাল রঙের ডিজিটাল ঘড়িটা। মেঘলা আর কুয়াশায় লঞ্চগুলো যেন মাঝ গঙ্গায় অদৃশ্য হয়েছে। কুয়াশায় উবে গিয়েছে সেকেন্ড হুগলি ব্রিজটাও। ‘আরে মশাই, কুয়াশা নয়, বলুন ধোঁয়াশা। দূষণে শহরের হাল আরও খারাপ হবে। একিউআই, কার্বন পার্টিকেলস বেড়ে গিয়েছে। ইএম বাইপাসের দিকটা ফাঁকা ফাঁকা তো…ভিজিবিলিটি তবু একটু ভাল। মেইন সিটিতে অবস্থা খুবই খারাপ।’ আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় চোখটা একটু বুলিয়ে নিয়ে দূষণ নিয়ে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সটা একটু ঝালিয়ে নিলেন রমেন মুখুজ্জে। মাথা নেড়ে সায় দিলেন তাঁর সঙ্গী বাকি প্রাতঃভ্রমণকারীরা।
আরও পড়ুন: কনকনে ঠান্ডায় জল কামানের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষি আইন বাতিলের দাবি কৃষকদের

দৃশ্য–২

‘আরে আজ বামেদের ডাকে ভারত বন্‌ধ না?’ নিজেকেই প্রশ্ন করে অনিমেষ। খেয়ালই ছিল না তার। ব্যান্ডেল লোকাল থেকে নেমে শিয়ালদাগামী বাস উঠতেই ভিড়ে চিঁড়ে চ্যাপ্টা। ‘দাদা প্লিজ একটু চেপে…’ পাশে বসা যুবকের দিকে তাকিয়ে অনিমেষ দেখে চোখে সুর্মা, লম্বা দাড়ি, খাটো পায়জামা। কথা প্রসঙ্গে নাম বলল, আবু সুফিয়ান। শিয়ালদা থেকে অনেক জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যাবে নাখোদা মসজিদ। কোন রুটের বাস ধরে কিভাবে যাবে জেনে নিচ্ছিল অনিমেষের কাছ থেকে। এদিকে, বড়বাজারের রাস্তায় ভিড় বাড়ছে। সাত সকালেই জ্যাম। তার মধ্যেই বন্‌ধের সমর্থনে লম্বা মিছিল। আমহার্স্ট স্ট্রিটে গিয়ে বাস আবার ১৫ মিনিট দাঁড়াল। এবার বন্‌ধ বিরোধীদের মিছিলে। এর মধ্যেই বুম্বা, ভোমলা ফোন করে জানাল, ডার্বির টিকিট অনলাইনে কিনে নিয়েছে। ‘যাক বাবা, এবার অন্তত মিস হবে না…’ নিশ্চিন্ত হল অনিমেষ। ইডেনে কেকেআরের হোম ম্যাচের টিকিট মিস হয়েছিল। শাহরুখ, প্রসেনজিৎকে এক ফ্রেমে দেখাটা হয়নি। যাক, এবার আইএসএলে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের গ্যালারির লোয়ার টিয়ারটা তো পাওয়া গিয়েছে। এদিকে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আপডেট, প্রিয় দলকে জেতাতে আজ কালীঘাটে পুজো দিতে গিয়েছে শুভঙ্কর, সুবর্ণা, হীরক, মফিজুলরা।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়া বনাম ভারত ১ম ওডিআই: ভারতের সম্ভাব্য একাদশ

দৃশ্য–৩

ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে কাল ছিল অমাবস্যার পুজো। একে হাই প্রেশার, তার উপর উপোস করে মায়ের শরীরটা খারাপ। পাড়ার ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেই সুইফট ডিজায়ারটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অদ্রিজা। অফিসে দেরি হচ্ছে। গন্তব্য টিসিএসের অফিস, সেক্টর ফাইভ। দাদা বৌদি আলাদা থাকে বেলেঘাটায়। দাদা বহুজাতিক সংস্থার মার্কেটিং হেড। বৌদি বাংলা নিউজ চ্যানেলে কাজ করে। নাইট ডিউটি করে দিনে ঘুমায়। ফোন করে ওদের ডিসটার্ব করতে চাইল না অদ্রিজা। মাসিরা থাকে যাদবপুরে। মাসতুতো ভাই সমরেশ প্রেসিডেন্সির ছাত্র। ‘কোথায় তুই? সবে পার্ক স্ট্রিট?’ সমরেশ ফোন তুলতেই অদ্রিজা বুঝতে পারে ভাই সবে মেট্রোয় চেপেছে। কারণ কথা কাটছে। “শোন না.. মায়ের শরীরটা খুব খারাপ। তুই ক্লাস বাঙ্ক করে একবারটি ডাক্তারটা দেখিয়ে দিয়ে যা না। আমার অফিস কামাই করা যাবে না বাবু…”। ‘ওকে ..ওকে..দিদিভাই..’ আশ্বস্ত করে সমরেশ ওরফে টুকাই। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে আজ তো সাউথ সিটির মাল্টিপ্লেকসে বিকেলের শো’তে ঝিমলি টিকিট কেটে রাখবে বলেছিল। এদিকে, রেডিও মির্চির অফিসে কাল আবার অডিশন আছে ওদের বাংলা ব্যান্ডের টিমটার। সিলেকশন বোর্ডে আছেন স্বয়ং নচিকেতা। এর মধ্যেই পাশের ফ্ল্যাটের কাকিমার ফোন, ‘শোন না টুকাই, কাল তোর দাদা বৌদিরা ব্যাঙ্গালোর ফিরে যাচ্ছে তো। সকালের ফ্লাইট। তুই একটা ভাল দোকান থেকে এক কেজি নলেন গুড়, ৫০টা তালশাঁস সন্দেশ আর কিছু নারকেল নাড়ু কিনে আনিস। আমি তোকে টাকা দিয়ে দেব বাবা। বুঝতেই পারছিস। ওদের তো এবার পুজোর সময় কিছু খাওয়াতে পারিনি।’ অনিমেষের এই এক সমস্যা, কাউকে মুখের উপর না বলতে পারে না। সে তো না হয় হল…। এদিকে, কলেজ স্ট্রিটে জরুরি কাজ আছে। অনেকদিন বই পাড়ায় ঢুঁ মারা হয়নি। যাওয়া হয়নি কফি হাউসেও। আজও হল না। বন্ধুরা সব চটে আছে।
আরও পড়ুন: চেন্নাই উপকূলে আছড়ে পড়ল নিভার

দৃশ্য–৪

পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে দক্ষিণেশ্বরে সাত সকালে সপরিবার পুজো দিতে এসেছে অনির্বাণ ও সুস্মিতা। কসবা থেকে গাড়ি নিয়ে সটান দক্ষিণেশ্বর। সঙ্গে অনির্বাণের মা, বাবা, শ্বশুর শ্বাশুড়ি, বাচ্চার আয়া মাসি। পুজো দিয়ে গন্তব্য সিক্স বালিগঞ্জ প্লেস। দুপুরের খাওয়া সেরে পরের গন্তব্য সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল চার্চ, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কিন্তু হাতে সময় বেশি নেই। সিক্স বালিগঞ্জ প্লেসে ঢুকে মেনু কার্ড হাতে নিয়েই বিপত্তি। কথায় কথায় সেই ঘটি বাঙালের দ্বন্দ্ব। অনির্বাণরা ঘোষ এবং ঘটি। সুস্মিতারা ‘চক্রবর্তী’ বাঙাল। এখানেও মেনু নিয়ে চিংড়ি বনাম ইলিশের একটা চাপা রেষারেষি হল। এর মাঝেই, অফিস কলিগ কুশল মিত্তিরের ফোন, ‘কাল গ্যালিফ স্ট্রিটে তোমাকে দূর থেকে দেখলাম মনে হল। কি কিনতে গিয়েছিলে কুকুর না পাখি?..আর বলো না… মেয়ের আবদারে একটা লাব্রাডরের ছানা আনতে গিয়েছিলাম আমি। আর শোনো পরশু বইমেলা যাচ্ছি। বই তো কিনব ঘোড়ার ডিম… ওই ঘোরাফেরা, খাওয়াদাওয়া হবে আর কি। তোমার গিন্নিকে নিয়ে এসো। আমার গিন্নিও যাচ্ছে। দে’জ পাবলিশার্সের সামনে মিট করব। ওকে?”
আরও পড়ুন: নেপালী কবির বাংলা কবিতা

দৃশ্য–৫

শীতের সন্ধ্যে। নন্দন চত্বরে চেনা ভিড়। ভিড় মোহর কুঞ্জেও। মোহর কুঞ্জে, ইলিয়ট পার্কে হয় মন দেওয়া নেওয়া। অনেক দশক ধরে এসবের নীরব সাক্ষী তিলোত্তমা। এক যুগলের আক্ষেপ, ‘বড্ড ভিড় এদিকটাই। মিলেনিয়াম পার্কেও বসার জো নেই। চলো কাল থেকে নিউ টাউনের ইকো পার্কে বসব।’ শিশির ভেজা সাঁজবাতির আলোয় তখন কোনও এক অঞ্জন তার বেলা বোসকে অঙ্গীকার করে, ‘চলো কালকেই রেজিস্ট্রি করে নিই। তারপর বলব বাড়িতে’। এ সবেরই সাক্ষী থাকে তিলোত্তমা। তার বয়সটা যে আজ ৩৩০। অজস্র ঘটনার সাক্ষী সে।
আরও পড়ুন: সঙ্কটে সুন্দরী: জলে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ক্লোরোফিলে ব্যাহত হচ্ছে সালোকসংশ্লেষ

এদিকে, অ্যাকাডেমির সামনে গাছ তলাগুলো ভিড়ে ঠাসা। কেউ কাউকে বোঝাচ্ছেন মেডিক্লেম করার উপকারিতা। কেউ বোঝাচ্ছেন মিউচুয়াল ফান্ড। ডানদিকে চলছে বেজায় তর্ক, সৌরভ বড় না সচিন বড় ব্যাটসম্যান? বাঁদিকে তখন তর্ক চলছে, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকেও বড় নাট্যকার ছিলেন উৎপল দত্ত। সত্যজিৎ রায় ঠিকই চিনেছিলেন প্রতিভা। আরেকজন ফুট কাটলেন, ‘কেন রমাপ্রসাদ বণিক বা রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তরাই বা ওঁদের থেকে কম কিসে?’ সঙ্গে রে রে করে করে উঠলেন এলআইসি অফিস ফেরতা বিরাজবাবু এবং টুরিজম অফিসের কেরানি আশিসবাবু। তার মাঝেই সমানে ডেকে চলেছেন এক বৃদ্ধ, ‘ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি…’ । …রাস্তার ধারে সিগারেট, চিপস, ফুচকা, রোলের দোকান। গড়িয়াহাট থেকে শ্যামবাজারে লক্ষ মাথার ভিড়ের মাঝেই লক্ষ মানুষের কলরবে হারিয়ে যায় লক্ষ কোটি কথা। কথার পিঠে কথা। একাকার হয়ে যায় মিনার, বিজলি, নিউ এম্পায়ার, রক্সি, পূর্ণ, প্রাচী, নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম। এর মাঝেই ফুচকা থেকে রসগোল্লা, বড়দিন থেকে ইদ, দুর্গাপুজো, সব স্বাদেই, রঙেই রঙীন হয় কল্লোলিনী।  নকশাল আমলের বাম মনস্ক কাকা জ্যেঠা থেকে শহরের টেকস্যাভি পঞ্চম প্রজন্ম। সবার মনের খবর রাখে সে। সবার জীবন যুদ্ধের সাক্ষী। এভাবেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্তের জনপদ তিলোত্তমা। জব চার্নকের কলকাতা। দোমিনিক লা পিয়েরের সিটি অফ জয়। আমার প্রাণের শহর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

ফ্রায়েড চিকেন আর পিৎজার যুগেও প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি হরিদাস মোদক

বিশ্বজিৎ মান্না আজ যা আছে, কাল হয়তো থাকবে না! বা বদলে যাবে। এটাই নিয়ম। ঠিক যেমন আমাদের প্রিয় শহর...

ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ: প্রথম দুটি ম্যাচে মাঠে দর্শক থাকবে না

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর ভারতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু হবে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চারটি টেস্ট ম্যাচ খেলবে...

অসুস্থ লালুপ্রসাদ যাদব

নিউমোনিয়ায় ভুগছেন বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা আরজেডি প্রধান লালুপ্রসাদ যাদব। ঝাড়খন্ড স্টেট মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী, উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার তাকে রাঁচির...

ব্রাজিলে শুরু হল কোভিড টিকা কর্মসূচী

ভারতের দেওয়া টিকা দিয়ে করোনা বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করল ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারের বিরুদ্ধে...

Recent Comments

error: Content is protected !!