রবিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২১
Home feature যত সুর সবই তোমার

যত সুর সবই তোমার

২৬৯ Views

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

তখন আশির দশক।
ভদ্রেশ্বরের মফস্বলী পরিবেশে একটু একটু করে বড় হওয়া শুরু।
আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতো ভোলাদা। ভোলা বিশ্বাস। আদ্যন্ত গান পাগল লোক। গান গাইতেও বেজায় ভালবাসতেন।
তবে সেটাই আমাদের জন্য মাঝেমধ্যে বড়ই পীড়াদায়ক হয়ে উঠতো। তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই বলছি – ভোলাদা ছিলেন রীতিমতো ভীষ্মলোচন শর্মা ও ঘসিট খাঁ’র দূরসম্পর্কের ভায়রাভাই। সুর লাগালেই হিরোশিমা-নাগাসাকি।
গলা যে তার খুব মিষ্টি বা সুরেলা তা একেবারেই নয়। কিন্তু হ্যাঁ, ওমন ডেডিকেটেড আর্টিস্ট খুব কম দেখেছি। তেমনি ভাল হারমনিয়াম বাজাতেন।
প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন গানের জন্য। সকাল-বিকেল হারমনিয়াম নিয়ে পড়ে আছেন।
মা বলতেন – আহারে, ভোলাটাকে মা সরস্বতী সুর দেননি ঠিকই, কিন্তু ওর মত সাধনা করতে পারলে তোরা মানুষ হয়ে যেতিস।
ভোলাদার সুরের হাত ধরে ছোট থাকতেই শুনে ফেলেছি ‘পৃথিবী বদলে গেছে’, ‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণযাত্রা যেদিন যাবে’, ‘ওপারে থাকব আমি’, ‘হয়তো আমাকে কারো মনে নেই’, ‘চিতাতেই সব শেষ’ বা’মিলন তিথির পুর্নিমা চাঁদ’- আরও কতশত গান। জেনেছিলাম গানগুলির সুরকার অজয় দাসের কথা।
ভোলাদা’ই প্রথম আলাপ করান কিশোর কুমার, লতা, আশা, মান্না দে, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এক ও অদ্বিতীয় অজয় দাসের সঙ্গে। ভোলাদার হাত ধরেই বাংলা ছায়াছবি ও তার গানের সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। বলতে দ্বিধা নেই, তার কাছে গান না শিখলেও তিনিই আমার প্রথম শিক্ষক।

***

ভোলাদা ছিল কিশোর কুমারের অন্ধভক্ত। আর হ্যাঁ অজয় দাসেরও। সুখেন দাসের ভাই হিসেবে শুধু তার পরিচয় নয়।
তিনি স্বাক্ষাত কিংবদন্তি, সুরকার অজয় দাস।
আর কি আশ্চর্য, ওমন কাঁচা বয়সে কখন আমিও যেন জড়িয়ে পড়েছিলাম সেই মানুষটির সঙ্গে। উঠতে বসতে তখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ‘যেমন শ্রীরাধা কাঁদেন’, ‘এই ত এসেছি আমি তোমার দাদামনি’, ‘সুখেও কেঁদে ওঠে মন’ বা ‘আমি যে কে তোমার তুমি তা বুঝে নাও’।
সিনেমার নাম জানিনা, কে গেয়েছেন তাও না শুধু সুরটা অজান্তে মাথায় জবরদখল নিয়েছে। সে এক অদ্ভুত ঘোর। আমার গোটা স্কুলজীবনে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল অজয়বাবুর।
‘এইচএমভি’ বা নাম না জানা সস্তা ধুলোটে সেই ক্যাসেটগুলোয় ‘মিলন তিথি’, ‘অনুরাগের ছোঁয়া’, ‘জীবন মরণ’, ‘পারাবত প্রিয়া’, ‘প্রতিশোধ’, ‘জীবন মরণ’, ‘ন্যায় অন্যায়’ বা ‘অমর কণ্টক’-র মত অজস্র অজানা সিনেমার নাম যত না জেনেছি তার চেয়ে বেশি খুঁজেছি অজয় বাবুর নাম। আর হ্যাঁ কিশোর কুমারের নাম।
অজয়-কিশোর যুগলবন্দীতে কি অদ্ভুত সেই সব গান, কি অদ্ভুত সেই সব গানের কথা আর…আর সুর!

আহা রে, আশির দশক। সে এক ম্যাজিক সময়।
তখন আটপৌরে উত্তমোত্তর বাংলা সিনেমা মানে সুখেন দাস, মহুয়া, রঞ্জিত মল্লিক, চিরঞ্জীত, চুমকি, অনুপ কুমার, তাপস, শতাব্দী, জয়, রীতা কয়রাল, মুনমুন সেন। মাঝে মাঝে মুম্বই থেকে উজ্জ্বল মুখ দেখিয়ে যাচ্ছেন মিঠুন, কমল হাসান, ড্যানিরা। পরিচালনায় বীরেনবাবু, অঞ্জন চৌধুরী, প্রভাত রায়, সুখেন দাস। আর গানে তখন মান্না দে, লতা, আশা, শ্যামল মিত্র আর নতুন করে বাংলার গ্রামে গঞ্জে, হাটে-বাজারে উঠে আসছেন কিশোর কুমার। সুখেন-অজয় দাস দুই ভাইয়ের ‘যৌথ খামারে’ তখন সিনেমা মানেই সুপার-ডুপার হিট। একান্নবর্তী হাই-পিচ, ঝাঁঝানো ‘মেলোড্রামা’ মিশে যাচ্ছে রক্তে। গ্রাম দিয়ে ঘেরা হচ্ছে শহর। অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ছে টালিগঞ্জে। যাত্রা আর সিনেমা মিশে যাচ্ছে একে অন্যের মধ্যে। তৈরি হচ্ছে বাংলা ফিল্মের নতুন ‘ঘরানা’। আর এই সব শরীরে, মনে মেখে একটু একটু করে মফস্বলী প্রেম যমুনায় ভেসে বড় হচ্ছি আমরা…

***

আমি কৃতজ্ঞ সুখেনবাবু, অজয়বাবুর কাছে। আমাদের সেই গেঁয়ো, মফস্বলি সেলুলয়েডের রঙিন, সুরেলা বারমাস্যা উপহার দেয়ার জন্য। এই চলতি সময়ের মাল্টিপ্লেক্স – ব্যাণ্ড সংস্কৃতি যাদের কোনদিন বুঝতে পারেনি। পারবেও না। ‘মেম’ আর চটুল হাসি, ঠাট্টা-তামাশা দিয়েই যাদের প্রতি চরম অবজ্ঞা ও অপমান ছুঁড়ে দেয়, আমি তাদের দলে নিজেকে আজও মিশিয়ে দিতে পারিনি। পারবও না। আজও সুখেনবাবু, অজয়বাবুর সেই সব গান আমার শৈশব থেকে কৈশোরের মাপকাঠি, প্রথম ‘দাস (দুজনেরই পদবী দাস) ক্যাপিটালে’র পাঠ। কত’জনই বা আজকাল আর শোনে ‘লালুভুলু’, ‘চারমূর্তি’ (মান্না দের কন্ঠে সেই ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ’ মনে পড়ে কি? আহা!) ‘অচেনা অতিথি’ বা ‘প্রতিশোধে’র সেই সব গান! আজও সে সব গান আমায় ভাবায়, কাঁদায়, হাসায়…

ভাবলেও অবাক লাগে যে মানুষটা প্রায় দু’দশক শাসন করেছেন বাংলার ফিল্ম মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, সেই অজয় দাস নিতান্ত অবহেলায়, লোকচক্ষুর আড়ালে নিঃশব্দে পাড়ি দিয়েছিলেন ‘ওপারে’। শেষ জীবনে পাননি কোন সঙ্গীত পরিচালনার অফার, অথচ দেড়শোর বেশি ছায়াছবিতে তার সুররোপন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। অজস্র হিট গানের রেকর্ড তার ঝুলিতে। কিশোর কুমারকে দিয়ে গাইয়েছেন একের পর এক অসাধারণ সব গান। কি সিনেমা, কি আধুনিক। পেয়েছেন বিপুল জনপ্রিয়তা। অথচ সারাজীবন অতি অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন এই নির্লোভ, নির্লিপ্ত, সহজসরল গান পাগল মানুষটি।

আশির দশকে যাদের জন্ম তারা অজয়বাবু ও তার সৃষ্টিকে কোনদিন ভুলবেনা। সত্যিই আজ মন খুলে বলতে ইচ্ছে করছে – ‘যত সুর সবই তোমার / যত গান সবই তোমার / আমার এ কন্ঠ ভরে…’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

স্যামসনের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং, তবুও শেষ হাসি হাসল পাঞ্জাব

স্কোরবোর্ড বলছে, আইপিএল ২০২১-এর চতুর্থ ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ রানে হারিয়ে দিয়েছে পাঞ্জাব কিংস। তবে সেটা দেখে ম্যাচের আসল ছবি বোঝা যাবে...

ধর্নায় বসবেন মমতা

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রচারের উপর 24 ঘন্টার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই...

মানুষ মরে এভাবেই, কেউ খোঁজ রাখে না

বিশ্বজিৎ মান্না ধরুন আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে, বাজারের থলে হাতে নিয়ে বেরোলেন। আপনার বাড়ির লোক বা আপনি কী...

ফের ক্ষমতায় দিদি, তবে বিজেপির আসন বাড়বে: বলছে সমীক্ষা

বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম বিরোধী দল হিসাবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেন্দ্রের শাসক দলের দাবি, রাজ্যে এবার তারাই ক্ষমতায় আসতে চলেছে।...

Recent Comments

error: Content is protected !!