বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০
Home District সুন্দরবনের এই সমুদ্র সৈকত গোয়াকেও হার মানাতে পারে

সুন্দরবনের এই সমুদ্র সৈকত গোয়াকেও হার মানাতে পারে

১,২০৩ Views

পশ্চিমবঙ্গে সমুদ্র সৈকত বললে আপনার মাথায় প্রথমে কি আসে? দিঘা, তাজপুর কিংবা মন্দারমনি বা বড়জোর বকখালি। কিন্তু আপনি কি জানেন কলকাতা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে সুন্দরবনে রয়েছে এমন একটি সমুদ্র সৈকত যা রূপে, গুণে বিশ্বের যে কোনো সমুদ্র সৈকতকে টেক্কা দিতে পারে। তবে পরিকাঠামোর অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার জন্য আজও প্রচারের আলো থেকে বঞ্চিত সুন্দরবনের এই ভার্জিন সি বিচ।

সুন্দরবনের পশ্চিমাংশে সীতারামপুর এবং গোবর্ধনপুর দ্বীপের মাঝখানে রয়েছে এই বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত। রাজ্য সরকারের আধিকারিকরা ইতিমধ্যে এই সমুদ্র সৈকতটির ব্যাপারে অবগত। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কান অবদি পৌঁছেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে এটি গোয়ার মতো হয়ে উঠতে পারে। পর্যটনের প্রসারে গুরুত্ব দিয়েছে রাজ্য সরকার। গোবর্ধনপুর সি বিচকে উন্নত করে তুলতেও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

কলকাতা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অপরিচিত গ্রামকে পর্যটন মানচিত্রে আনার জন্য একটি বিশদ রোডম্যাপ গড়ে তুলতে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে শ্রেয়ী ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

আকর্ষণ কোথায়

খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, প্রকৃত অর্থেই এই সমুদ্র সৈকতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে এখানে বিপুল কর্মসংস্থানের পাশাপাশে এলাকার অর্থনীতিও মজবুত হবে।

বদ্বীপের উপকূল বরাবর বিস্তৃত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত হল এখানকার মূল আকর্ষণ। মূল ভুখন্ড থেকে এটি ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। চরের সাহায্যে এটি সংযুক্ত। সাদা বালির সৈকতে নীল ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্য দেখলে আপনার বলিউডের ফরেন লোকেশনের কোনো শ্যুটিংয়ের দৃশ্যের কথা মনে পড়তে পারে! অন্যান্য জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকতে দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু পর্যটকের ফেলে যাওয়া নোংরা, আবর্জনার অভিশাপ থেকেও এখনও মুক্ত গোবর্ধনপুর সমুদ্র সৈকত। সমুদ্র সৈকতে প্রচুর লাল কাঁকড়া দেখা যায়। সমুদ্র উপকূলে রয়েছে অসংখ্যা ঝাউ গাছ। তার পরে রয়েছে গ্রাম। অর্থাৎ একটি বিচ ডেস্টিনেশনের যা যা থাকা দরকার, গোবর্ধনপুরে প্রায় সবই মজুত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের তুলনায় এখানকার সৈকতের মান অনেক উন্নত। এখানে জল খুবই পরিষ্কার। বালির মানও খুব ভালো।

নিকটবর্তী দুটি গ্রামে প্রায় ৫০টি পরিবার বসবাস করে। তারা মূলত মৎসজীবী। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রামের বাসিন্দারা ভীষণভাবে চাইছেন তাদের এলাকার সমুদ্র সৈকতকে একটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হোক। এমনকি পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলেও গ্রামবাসীরা খুব একটা বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না বলেই স্থানীয় সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।

কি বলছেন স্থানীয়রা

গোবর্ধনপুরের বাসিন্দা বিমল দাস বলেন, আমরা যখনই সুন্দরবনের কথা বলি তখন অবধারিতভাবে আমাদের মাথায় জঙ্গলের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু আমাদের গ্রামে অসাধারণ সুন্দর একটি বিচ আছে। এটা যদি একটা ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে ওঠে, তাহলে হোটেলে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। বামফ্রন্টের আমলে আমরা স্থানীয় বিধায়ককে এই এলাকাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অনুরোধ করেছিলাম। তবে তারপর বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখন কি হয় সেটাই দেখার বিষয়। সরকার যদি সদর্থকভাবে এলাকার উন্নয়নে উদ্যোগী হয়, আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব।

ঐতিহাসিক আকর্ষণ

বিচের কাছে বিমল সাহুর বাড়ি। সমুদ্রের ঢেউয়ে উপকূলে ভেসে আসা নানা জিনিস সংগ্রহ করা তার একটা নেশা বলা যায়। গত কয়েক বছর ধরে সৈকতে ভেসে আসা টেরাকোটা ট্রে, ফুলদানি, বাসনপত্রের মতো নানা জিনিস তার সংগ্রহে রয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজি বিভাগের অধ্যাপক রুপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমরা ওখানে একবার গিয়েছিলাম। আমরা ওখানে অনেক মৌন্ডের সন্ধান পেয়েছি। আমার মনে হয় এখানে খননকার্য চালালে অতীতের অনেক কিছু সম্পর্কে জানা যাবে।

সরকারের তরফ থেকে এলাকায় একটি মিউজিয়াম গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কেও প্রয়োজনীয় বিষয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।

অসুবিধা কোথায়

মূল সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। কলকাতা থেকে গোবর্ধনপুর যেতে আপনার কাল ঘাম ছুটতে পারে। কাকদ্বীপ পর্যন্ত ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ভালো। তবে তারপর গঙ্গাধরপুর থেকে পাথরপ্রতিমা বাজার পৌঁছনো রাস্তার বেহাল দশা হয়েছে। রামগঙ্গা ঘাট থেকে গোবর্ধনপুর পৌঁছতেও সমস্যা রয়েছে। এখান থেকে দিনে সরাসরি মাত্র একটি ফেরি ছাড়ে। সেটা কোনোভাবে মিস করলে আবার একদিন অপেক্ষা করতে হবে। সকাল ১০টায় ফেরি ছাড়ে। যারা এরপর রামগঙ্গায় সকাল ১০টার পরে পৌঁছবেন, তাদের আবার দুপুর ১.৩০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদমারি পর্যন্তই লঞ্চ যায়। মৃদঙ্গ ভাঙা নদী এবং কার্জনস ক্রিক হয়ে পৌঁছতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগে। সেখান থেকে ১৮ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তায় মোটরভ্যানে চেপে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। প্রায় এক ঘন্টা মতো সময় লাগবে।

বিদ্যুৎ, খাবার দোকান, হোটেলও এখানে একটা বড় সমস্যা। পরিকাঠামো না গড়ে ওঠায় বেসরকারী সংস্থাগুলি এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তবে পাথরপ্রতিমা থেকে গোবর্ধনপুর পর্যন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। ফের সার্ভিস চালু করারও পরিকল্পনা নিয়েছে। সেগুলি বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। সেতু নির্মাণের জন্য রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রের কাছে সাহায্য চাইতে হবে।

কিভাবে পৌঁছবেন

ট্রেনে বা সড়কপথে কাকদ্বীপে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে পাথরপ্রতিমার জন্য আবার একটি বাসে উঠতে হবে। ঘন্টাখানেক মতো সময় লাগবে। রামগঙ্গা বা পাথরপ্রতিমা ঘাট থেকে চাঁদমারি ঘাটের জন্য নৌকা ধরতে হবে। প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লাগবে। সেখান থেকে মোটোরভ্যানে করে গোবর্ধনপুর পৌঁছাতে হবে। সময় লাগবে প্রায় এক ঘন্টা।

কি করবেন

ঝাঁউ বন ধরে সমুদ্র সৈকতে হেঁটে বেড়ান। স্থানীয়দের সঙ্গে মিশুন। জি প্লটের অনেক অজানা কথা জানতে পারবেন। ঝাঁউবনে বসে অক্সিজেনপূর্ণ দূষণমুক্ত বায়ুতে প্রাণভরে নিশ্বাস নিন! সৈকতে জেলেদের জন্য অপেক্ষা করুন। দিনের শেষে প্রচুর মাছ নিয়ে তারা উপকূলে ফেরেন। নিকটবর্তী ধঞ্চী জঙ্গল, কলস, বনিক্যাম্প এবং ভগবৎপুর কুমীর প্রকল্প ঘুরে আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

আপাতত গোবর্ধনপুরে একটি কটেজ রয়েছে। মোট ৩টি রুম আছে, যেখানে ১০ জন থাকতে পারে। কটেজে রয়েছে দুটি ওয়েস্টার্ন টয়লেট। থাকা-খাওয়া নিয়ে দিনপ্রতি মাথাপিছু খরচ ১২০০ টাকা। সংস্থার অফিস রয়েছে কলকাতায় মেনকা সিনেমা হলের কাছে। যাওয়ার আগে যোগাযোগ করে যাওয়াই শ্রেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মধু এনেও উপযুক্ত দাম পান না সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীরা

আলামিন ফকির। বয়স বছর কুড়ি। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দা। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করার জন্য পাস জোগাড় করতে হয়। সেই জন্য স্থানীয় এক...

এক ওভারে পাঁচ ছক্কা: আইপিএল ২০২০-তে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেন রাহুল তেওয়াটিয়া

রবিবার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) একটি ম্যাচে শার্জায় মুখোমুখি হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস এবং কিংস ইলেভন পাঞ্জাব। এই ম্যাচে ব্যাটিং দক্ষতার মাধ্যমে চাঞ্চল্য...

করোনা আক্রান্ত পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা, আরোগ্য কামনায় পূজার আয়োজন করল তৃণমূল

বিশ্বজিৎ মান্না পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল তৃণমূল কংগ্রেস।...

আইপিএল ২০২০: সম্পূর্ণ সূচি, তারিখ, ভেনু

বহু প্রতিক্ষিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে ভারতের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে আইপিএল। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে...

Recent Comments

error: Content is protected !!