বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০
Home District সুন্দরবনকে নিজের হাতে গড়েছিলেন যে ইংরেজ অফিসার

সুন্দরবনকে নিজের হাতে গড়েছিলেন যে ইংরেজ অফিসার

২৮৮ Views

নিজের ঘনিষ্ঠ মহলে হ্যামিল্টন সাহেব বলতেন, তিনি মহাজনদের পছন্দ করেন না। এমনকি মহাজনদের তিনি পরান্নভোজী বলেও কটাক্ষ করতেন। জোতদারদেরও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। অর্থাৎ এক কথায় মিডলম্যানদের নিয়ে যেখানে কারবার হত, তা মোটেও হ্যামিল্টন সাহেবের পছন্দ হত না। এমনটাই জানালেন সুন্দরবনের গোসাবার বাসিন্দা তথা পেশায় স্কুল শিক্ষক স্বপন মণ্ডল। সুন্দরবন এলাকার ভূমি পুনরুদ্ধার নিয়ে তিনি ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন।

জানা গিয়েছে, ১৯৪৩ সালে বাংলায় যখন দুর্ভিক্ষ চলছে, তার কোনো আঁচ গোসাবায় পড়েনি। এই দাবি বিশ্বাস করতে অনেকের অসুবিধা হতে পারে। সেটা স্বাভাবিক। কারণ এই দুর্ভিক্ষের কারণে ৬০.৩ মিলিয়ন জনগণের মধ্যে প্রায় ২.১ থেকে ৩ মিলিয়ন মানুষ অনাহার, ম্যালেরিয়া ইত্যাদির দরুণ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

স্বপন বাবু জানান, এই প্রসঙ্গে প্রমাণ হিসেবে একাধিক নথি রয়েছে। গোসাবার সঙ্গে ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিল্টন নাম স্কটল্যান্ডের ওই ইংরেজ আধিকারিকের কথা প্রায় সবার মুখেই শোনা যায়। হ্যামিল্টন তখন বোধহয় সদ্য কুড়ি পেরিয়েছেন। স্ট্র্যান্ড রোডে ম্যাকিনন ম্যাককেইনজে অ্যান্ড কো. লি. নামক একটি সংস্থার কলকাতা অফিসে তাকে পাঠানো হয়। তখনকার দিনে সুন্দরবনের দ্বীপগুলিতে সাধারণত মানুষের বসবাস ছিল না। সুন্দরবনের দ্বীপগুলিতে তখন জলদস্যু এবং মানুষখেকো বাঘের উৎপাত ছিল। নদীতে প্রচুর কুমির ছিল। ইতিমধ্যে কোম্পানির তরফ থেকে চিহ্নিত করা হয়, কোন কোন অংশগুলি উর্বর জমিতে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। জমিকে বিভিন্ন লটে ভাগ করা হয়েছিল। স্বপন বাবু বলেন, কেবলমাত্র বাংলাতেই প্রায় ২৩৬চি লট অথবা পুনরুদ্ধারযোগ্য জমি চিহ্নিত করা হয়েছিল। এটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে এই একগুচ্ছ দ্বীপে ব্যাপক পরিমাণে ধান চাষ করা হবে। দ্বীপগুলিতে জনবসতি গড়ে উঠবে। সেই অনুযায়ী লটগুলি ইজারা দেওয়া হয়েছিল।

ব্যক্তিগত ক্ষমতার ভিত্তিতে হ্যামিল্টন সুন্দরবনের জমিগুলি ইজারায় দিয়েছিলেন। তিনি তার জার্নালে লিখেছেন, বাংলার সুন্দরবনে এক টুকরো জমি এখন বাঘ, হরিণ, বুনো শুয়োর এবং কুমিরের গৃহে পরিণত হয়েছে। তবে দুশ অথবা তিনশ বছর আগে এখানে পুরুষদের বসবাস ছিল। এখনও পুরানো বিল্ডিংয়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সেই জমির জন্য আমি বাংলার সরকারের কাছে আবেদন করছি। ভদ্রলোক, রায়ত এবং ভারত সরকারের সাহায্যে আমি ৩০,০০০ বিঘা অথবা ১০,০০০ একর জমিতে জমিদারি ব্যবস্থা চালু করব। তারপর এটি বিনামূল্যে বাংলার সরকারের কাছে হস্তান্তর করব।

নিজের বিশ্বস্ত কুলিদের নিয়ে তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন। লটগুলির অবশিষ্টাংশ বাঙালি ভদ্রলোকরা গ্রহণ করেছইলেন। বাঙালি মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা এই প্লটগুলি সাবলিজে দিয়ে ব্যাপক মুনাফা অর্জন করতেন। হ্যামিল্টন দ্বীপগুলিতে যাতায়াত করতেন। তিনি সুন্দরবনে থেকে দ্বীপগুলিকে বাসযোগ্য করে তোলেন। গোসাবার স্কুল শিক্ষক কালিপদ ভট্টাচার্য ১৯৫৫ সালে হ্যামিল্টনের একটি জীবনী লিখেছিলেন, যার নাম ছিল মহাপ্রাণ স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিল্টন। এই বইতে ভট্টাচার্য লিখেছেন, প্রতিবছর হ্যামিল্টন যখন আসতেন, তখন তিনি কাঠের তৈরি বাংলোতে থাকতেন। গোসাবা কেবলমাত্র হ্যামিল্টন সাহেবের স্বপ্ন নয়, মানুষের দুঃখ-কষ্টের একটা প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। গোসাবায় পৌঁছানোর এক বছর পর, অর্থাৎ ১৯০৪ সালে তিনি সেখানে কো-অপারেটিভ আন্দোলন শুরু করেন। তার প্রচেষ্টা বোঝার জন্য সেই মানুষটিকে বোঝা ভীষণ প্রয়োজন। তিনি লিখেছিলেন, বিশ্বের কার্যকরী মূলধন টাকা নয়, এটি হল মানুষ। ভারত সরকার যখন এই উপলব্ধির পর ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তখন উত্তাল সমুদ্র শান্ত হবে এবং ঝড়ের মেঘ গায়েব হবে।

এই দ্বীপে পৌঁছানোর পর হ্যামিল্টন প্রথমে যে কাজটি করেছিলেন, তা হল এখানকার জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলা। তিনি জঙ্গল পরিষ্কার করেন এবং জলাভূমিকে কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত করে তোলেন। জমিতে যাতে নোনা জল প্রবেশ না করে তার জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। তখন পানীয় জলের বিপুল সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। এই সমস্যার সমাধানে হ্যামিল্টন অনেক টাকা খরচ করে জল পরিশোধনকারী একটি মেশিন ক্রয় করেছিলেন। এই মেশিনের অবশিষ্টাংশ এখনও গোসাবায় রয়েছে। এটি এবং তার বাড়ি এখন পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই পদক্ষেপগুলি অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। তখন হ্যামিল্টন সাহেব অধিক মজুরিতে কাজ করানোর জন্য ছোটোনাগপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া এবং ময়ূরভঞ্জ থেকে গোসাবায় শ্রমিক নিয়ে আসেন। জলের সমস্যা মেটানোর জন্য তিনি গ্রামের মধ্যেই জলের ট্যাঙ্ক স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করতে এই জলের ট্যাঙ্কগুলির বাঁধে চারা গাছ রোপণ করা হয়।

চার বছর পর এই প্লটগুলি শেষ পর্যন্ত কৃষিযোগ্য হয়েছিল। তারপরেই এসেছিল বিধ্বংসী বন্যা, যা সমস্ত বাঁধ এবং মাটিকে ধুয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল। চাষের জন্য ফের একবার জমি অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। মণ্ডল বলেন, হ্যামিল্টনের দক্ষতা, দূরদর্শিতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। তিনি নতুনভাবে কাজ শুরু করতেন। ১৯০৯ সালের জনগণনা অনুযায়ী, গোসাবায় ৯০০ মানুষ বসবাস করতেন, যার মধ্যে ৬০০ জন ছিলেন শ্রমিক। এদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন এস্টেট স্টাফ। অবশিষ্টরা ছিলেন সেখানে পাকাপাকিভাবে বসবাস করা কৃষক। ১৯১০ সালে কো-অপারেটিভ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন হ্যামিল্টন।

প্রথমে তিনি কৃষকদের হাতে লিজের মাধ্যমে জমি তুলে দিয়েছিলেন। মণ্ডল বলেন, একজন ব্যক্তি কেবলমাত্র ২৫ বিঘা জমি নিজের দখলে রাখতে পারতেন। এবং তার স্ত্রী আরও ২০ বিঘার জন্য আবেদন করতে পারতেন। সব মিলিয়ে একটি পরিবারের কাছে উপলব্ধ জমির পরিমাণ ছিল ৪৫ বিঘা। কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেন হ্যামিল্টন। পরান্নজীবীদের তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। মণ্ডল বলেন, হ্যামিল্টনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এলাকার বাসিন্দাদের প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর করে তোলা। এবং এই ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি নিজের এলাকায় কৃষকদের সুদ মুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই ভাবনার মাধ্যমেই ১৯১৮ সালে তিনি গড়ে তোলেন গোসাবা কো-অপারেটিভ স্টোর।

এই কো-অপারেটিভের উদ্দেশ্য ছিল এলাকারা বাসিন্দাদের ন্যায্য মূল্যে চাল, ডাল, সাবান, কেরোসিন ইত্যাদি সরবরাহ করা। ১৯২৫ সালে কৃষকদের তরফে বস্ত্র বিক্রয়ের জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে হ্যামিল্টন দেখতে পেয়েছিলেন যে, শস্যের থেকে চালের মূল্য বেশি। দু বছর পর তিনি একটি রাইস মিল গড়ে তোলেন। আরও দু বছর পর তিনি ধর্মগোলা বা ধানের শস্যের জন্য একটি ভাণ্ডার গড়ে তোলেন।

মণ্ডলের ব্যাখ্যা, ফসল ঘরে তোলার পরেও শস্যগুলি ভেজা অবস্থায় থাকত এবং তাতে বেশি অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকত না। যেহেতু গ্রামবাসীরা নিজেদের টাকায় শস্যভান্ডার গড়ে তুলতে পারত না, তাই হ্যামিল্টন এর ব্যবস্থা করেছিলেন। সাধারণ গোলার মধ্যেই চাল গচ্ছিত রাখা হত এবং যখন বাজারে ভালো দাম পাওয়া যেত তখন বিক্রি করা হত। কর অর্থরাশি হ্রাস করার পর কো-অপারেটিভের লভ্যাংশ থেকে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ সহযোগে বিক্রয় থেকে জনগণ কিছু টাকা নিজেদের পকেটে রাখতে পারতেন। এর মাধ্যমে ঋণ অর্থরাশির পরিমাণও ক্রমশ হ্রাস পেত। মণ্ডল যোগ করেনন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হত যে প্রতিটি কৃষক তাদের ঋণ পরিশোধ করছেন।

অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে গোসাবা একটি মডেল ফার্ম হয়ে ওঠে। ফ্রি স্কুল, নাইট স্কুল এবং ফ্রি ডিসপেন্সারি তৈরি হয়। হ্যামিল্টনের হাত দিয়েই ১ টাকার নোটের প্রচলন করা হয়েছিলষ এতে বলা হয়, স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিল্টন বহনকারীকে চাহিদাক্রমে কো-অপারেটিভ ভাণ্ডারে গৃহীত মূল্যবান বস্তুর বদলে এক টাকা মূল্যের চাল, কাপড়, তেল অথবা অন্যান্য পণ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

বাংলায় দুর্ভিক্ষের সময় এই স্টোরহাউসগুলি গোসাবার বাসিন্দাদের প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়। মণ্ডল বলেন, ওই বছর কো-অপারেটিভ ইন্সপেক্টর যিনি আর্থিক নথিপত্র অডিট করেছিলেন, তিনি তার রিপোর্টে পর্যবেক্ষণ করেন যে দুর্ভিক্ষের সময় গোসাবা কো-অপারেটিভ লাভের মুখ দেখেছিল এবং এই এলাকায় দুর্ভিক্ষের কোনো প্রভাই পড়েনি। সমস্ত লিখিত রেকর্ড কো-অপারেটিভ সোসাইটির অফিসে পাওয়া গিয়েছে। গোসাবা কো-অপারেটিভ সোসাইটির গ্রেড সি থেকে বাড়িয়ে বি করেছিলেন ইন্সপেক্টর – যার মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে দুর্ভিক্ষের বছরে সোসাইটির পারফরমেন্সের তুলনামূলক উন্নতি হয়েছিল।

সেই দিক থেকে হ্যামিল্টনের খুব প্রিয় জায়গা ছিল গোসাবা। এতটাই প্রিয় যে তিনি নিজের উইলেও এটি স্মরণ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ট্রাস্টিরা দেখবেন যে গোসাবার বাঁধগুলি সঠিক অবস্থায় আছে। এবং এটা আমার ইচ্ছে যে এখন অনুরূপ উদ্দেশ্যে সম্পত্তিগুলি ব্যবহার করা হবে। ভারতের অন্যত্রও একই উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করা হবে।

মূল প্রতিবেদনটি দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ছবি সৌজন্যে উইকিপিডিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

করোনা আক্রান্ত পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা, আরোগ্য কামনায় পূজার আয়োজন করল তৃণমূল

বিশ্বজিৎ মান্না পাথরপ্রতিমার বিধায়ক সমীরকুমার জানা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তার দ্রুত আরোগ্য কামনায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করল তৃণমূল কংগ্রেস।...

আইপিএল ২০২০: সম্পূর্ণ সূচি, তারিখ, ভেনু

বহু প্রতিক্ষিত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এবারে ভারতের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে আইপিএল। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে...

বাবর আজমকে দিশাহীন মনে হচ্ছে: শোয়েব আখতার

ম্যাঞ্চেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠি দ্বিতীয় টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৬ রানের টার্গেট সহজে পৌঁছে গিয়ে ৫ উইকেটে জয় অর্জন করেছে আয়োজক...

আইপিএল ২০২০: চেন্নাই সুপার কিংসে রায়নার স্থান দখল করতে পারেন ঋতুরাজ গায়কোয়াড়

ইদানিং বেশ কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে চেন্নাই সুপার কিংস। আইপিএল ২০২০ শুরু হওয়ার আগেই স্কোয়াডের মোট ১২ জন সদস্যের কোভিড-১৯ পরীক্ষার...

Recent Comments

error: Content is protected !!