সোমবার, মে ১৭, ২০২১
Home country রবীন্দ্রভারতীর বসন্ত উৎসব: চাঁদ উঠেছিল থেকে ভজ গৌরাঙ্গ এবং কিছু ‘অশ্লীল’ প্রশ্ন

রবীন্দ্রভারতীর বসন্ত উৎসব: চাঁদ উঠেছিল থেকে ভজ গৌরাঙ্গ এবং কিছু ‘অশ্লীল’ প্রশ্ন

৩২২ Views

পাঁচুগোপাল মান্না

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত উৎসব পালনকে কেন্দ্র করে গত চব্বিশ ঘন্টায় রাজ্যে বিতর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছে। কার দোষ, কার ভুল, সেসব নিয়ে এখন কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে রাজ্যের প্রথম সারির এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চান্সেলর ইস্তাফাপত্র পেশ করেছেন। ঠিক কি ঘটেছিল রবীন্দ্রভারতীর সেই বসন্ত উৎসবে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, ইউটিউবার রোদ্দুর রায়ের একটি গানের লাইন কয়েকজন মেয়ের পিঠে লেখা রয়েছে। গানের লাইনটি অশ্লীল। যারা ওই গানটি সম্পূর্ণ দেখেছেন রোদ্দুরের চ্যানেলে তারা জানেন, গোটা গানটাই অশ্লীল শব্দে ভরা। মেয়েদের পিছনে কয়েকজন ছেলের বুকেও অশ্লীল শব্দ লেখা ছিল। এছাড়া বসন্ত উৎসবে উপস্থিত আরও অনেক তরুণ-তরুণীর গায়ে-পিঠে আপত্তিকর শব্দ লেখা ছিল বলে ভাইরাল হওয়া ছবি থেকে জানা গিয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তবে এর মধ্যেই অশ্লীলতায় অভিযুক্ত তরুণীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিটি রোড ক্যাম্পাসে হাজির হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই হুগলি, চূঁচূড়া, ব্যান্ডেল, চন্দননগরের মতো এলাকার বাসিন্দা। কেউই কলকাতার নন। সংবাদমাধ্যম সূত্রে এমনটাই জানা গিয়েছে।

কোনটা শ্লীল আর কোনটা অশ্লীল এটা নিয়ে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ব্যক্তি বিশেষে তা পৃথক হলে তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। রবীন্দ্রভারতীর এই ঘটনায় যে বিষয়টা সবথেকে বেশি নজর কেড়েছে তা হল, এফআইআর দায়ের হওয়ার পরেই অভিযুক্ত তরুণীদের ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

যারা ইউটিউবে রোদ্দুর রায়ের চ্যানেলের কিছু ভিডিও দেখেছেন, তারা জানেন রোদ্দুর রায় কি ধরণের গান, কবিতা লেখেন। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে যে গান, সেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাঁদ উঠেছিল গগনের আদলে একটি প্যারোডি। গানটির ভিডিও ইতিমধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ বারেরও বেশি দেখা হয়েছে। রোদ্দুর রায় তার চ্যানেলে নিজেকে বিশ্বকবি বলে দাবি করেন। পোস্ট মর্ডার্ন সাহিত্যচর্চায় তিনি বিশ্বাস করেন। তার গান, কবিতার পরতে পরতে রয়েছে অশ্লীল শব্দ, শাসকের বিরুদ্ধে আক্রমণ।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত উৎসবে ওই ছাত্রছাত্রীরা যা করেছেন তার তদন্ত চলছে। তারা ঠিক করেছেন না ভুল করেছেন সেটা পুলিশ-প্রশাসন বলবে। তবে হুজুগে গা ভাসানো বাঙালিদের অধিকাংশই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখাচ্ছেন। এই ঘটনার নিন্দা করতে গিয়ে উলটে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল, মিম এবং খিস্তির বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন।

এই ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে বিকৃত করে কোনো গান রচনা করা নিঃসন্দেহে অনুচিত। অভিযুক্ত ছাত্রীরা সেটা উপলব্ধি করেছেন বলেই সটান ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। কিন্তু মশাই, ইউটিউব নামক একটি স্থানে প্রায় প্রতিদিন যে বিশ্বকবি রোদ্দুর রায় তার সমস্ত সৃষ্টি আপলোড করে চলেছেন তা বন্ধ করতে পারবেন তো? রোদ্দুর রায় এখন রীতিমতো একজন সুপারস্টার বাঙালি ইউটিউবার। এইসব ভিডিও বানিয়ে তিনি টাকাপয়সাও রোজগার করছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে তার ফ্যান/ফলোয়ার্সের সংখ্যাও বিশাল। এহেন রোদ্দুর রায় প্রায়শই তার চ্যানেলে অশ্লীলতায় ভরা অনেক গান, কবিতা আপলোড করছেন। সেটা অবশ্য তিনি জনসমক্ষে, মানে বসন্ত উৎসবের মতো কোনো মুক্ত মঞ্চে করছেন না বটে, তবে ইউটিউব মানে তো সেটাও একটা পাবলিক প্ল্যাটফর্ম। সেখানে কোটি কোটি অডিয়েন্স রয়েছেন। সারা বিশ্ব থেকে তারা রোদ্দুর রায়ের এইসব ভিডিও দেখছেন। চাঁদ উঠেছিল গগনে প্যারোডিটা রোদ্দুর রায়ের অনেক পুরানো একটি গান। হঠাৎ করে সেটা তৈরি হয়নি। ইউটিউবে গানটি ৩ মিলিয়ন ভিউজ হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। যারা রবীন্দ্রভারতীর কাণ্ড নিয়ে গেল গেল রব তুলছেন, তাদের বলছি, ইউটিউবে গিয়ে কি একবারও রোদ্দুর রায়ের চ্যানেলটা দেখেছেন? না দেখে থাকলে প্লিজ দেখুন। তারপর মন্তব্য করুন। সেক্ষেত্রে কি তৎপরতা দেখানো হয়, সেটা দেখার জন্য আমি ভীষণ উদগ্রীব।

আর একটা প্রশ্ন হল, আমরা, মানে বিশেষত বাঙালিরা, যারা ইতিমধ্যে নিজের মাতৃভাষাকে মোটামুটি দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা ভাষায় পরিণত হতে সক্রিয়ভাবে বাজার অর্থনীতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, তারা এত সিলেক্টিভ কেন? অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় যেই একটি ঘটনা বা বিষয়ের বিরুদ্ধে ১০ জন মুখ খুললেন, তখন ১১তম ব্যক্তি হিসেবে গো উইথ দ্য ফ্লো মতাদর্শে দিক্ষিত হয়ে কেন আপনিও তাদের স্রোতে গা ভাসান? রোদ্দুর রায়ের চাঁদ উঠেছিল গগনের বহু আগে একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার গান তৈরি করা হয়েছিল একটি কীর্তনের লাইনের আদলে। ভজ গৌরাঙ্গ লহ গৌরাঙ্গের নাম রে বলে চিল্লিয়ে ওঠা সেই মিউজিক ভিডিওতে ছবির নায়ক নাইট ক্লাবে মহিলাদের সঙ্গে উদ্যাম নৃত্য করছেন। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে চলছে ডিস্কো বিটে ভজ গৌরাঙ্গের নাম। রবীন্দ্রনাথ যেমন বাঙালির আবেগ, তেমনি কীর্তন হল বাঙালি সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটার সঙ্গে ধর্মের যোগ দেখলে ভুল হবে। বাণিজ্যিক ছবিতে সেই গান যখন ব্যবহার করা হয়, তখন কোথায় থাকে আমাদের এই রুচিবোধ? হিপ হপ বা Rap এখন ভারতে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। হানি সিং, রাফতার, ইমরান খান, বাদশার মতো হিপহপ গায়কদের জনপ্রিয়তা কতটা, সেটা তাদের ইউটিউব চ্যানেলে একবার চোখ বোলালেই দেখতে পাবেন। কোটি কোটি সাবস্ক্রাইবার, প্রতি ভিডিওতেই কয়েক মিলিয়ন ভিউজ। এবং তাদের প্রায় প্রতিটি গানেই রয়েছে যৌনতার সুড়সুড়ি। পাশ্চাত্যের হিপ হপ বা Rap আরও অশ্লীলতায় ভরা। তারা তো দিব্যি সেলিব্রিটি স্টেটাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাতে দোষের কিছুও দেখা যায় না।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তার প্রতি বিন্দুমাত্র সমর্থন না রেখেই বলা যায়, বিষয়টা লঘু পাপে গুরু দণ্ডের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। বসন্ত উৎসবে গিয়ে ওই তরুণ-তরুণীরা মজা করছিলেন। তারা কাউকে খুন করেননি, চুরি করেননি, ডাকাতি করেননি, ধর্মের নামে উসকানিমূলক মন্তব্য করেননি, ফ্রিজে গরুর মাংস রয়েছে বলে ভুয়ো অভিযোগ তুলে কাউকে পিটিয়ে মারেননি, ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়ার স্লোগান তোলেননি, কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গোলি মারো সালোঁ কো বলেও কোনো চরম অশ্লীলতায় ভরা স্বরে চিৎকার করেননি। এগুলি যদি অশ্লীল না হয়, তাহলে রবীন্দ্রভারতীর ঘটনা নৈতিক ভাবে অন্যায় হতে পারে, কিন্তু যেভাবে হুজুগে বাঙালি অশ্লীলতার দোহাই দিয়ে গেল গেল বলছেন তাদের বোধহয় কুয়োর বাইরে বেরিয়ে এসে দুনিয়াটা একটু দেখা প্রয়োজন। প্রতিবাদ করার আগে ভণ্ডামির চশমাটা খুলে রাখুন।

লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। এর জন্য দৈনিক সুন্দরবন কোনোভাবেই দায়ী নয়। ছবি সৌজন্যে ফ্রি প্রেস জার্নাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ফের মৃত্যু

শাহীন বিল্লা, সাতক্ষীরাসুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে রেজাউল ইসলাম নামে এক মৌয়াল নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (১৪ মে) বিকেলে বাংলাদেশের পশ্চিম...

দৈনিক সুন্দরবনের সাংবাদিককে মারধর

দৈনিক সুন্দরবন ওয়েবসাইটের এক সাংবাদিককে মারধর করার অভিযোগ উঠল কুলতলিতে। কোভিড বিধি না মেনে শুক্রবার কুলতলীর রামকৃষ্ণ আশ্রমের কাছে জেটিঘাটে অনেকে ভিড়...

বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিতে হবে: মোদিকে চিঠি বিরোধীদের

ভারতে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ক্রমশই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। হাসপাতালো রুগীর জায়গা নেই। অক্সিজেনের অভাব। ভ্যাকসিনের অভাব। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে।...

অতিমারির অন্ধকারে ঈদে চাঁদ যেন আশার আলো

সীতাংশু ভৌমিক, ফরিদপুর (বাংলাদেশ) প্রতিবছর ঈদ আসে, পরিযায়ী শ্রমিক-কর্মজীবী মানুষেরা স্বজনদের কাছে ফিরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ থেকেই...

Recent Comments

error: Content is protected !!