লকডাউন: পজিটিভ নিপাত যাও, নিপাত যাও!

৮৭ Views

সাগ্নিক চৌধুরী

লকডাউনের ৫৪তম দিনে হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে একটা কর্কশ গলা, বলেছিলাম না সবাই মরে যাবে শুধু ত্রিবেদী বেচেঁ যাবে।

– কী হয়েছে আবার?

– আবার মানে? বলেছিলাম মাত্র কয়েকদিন আছে তোমাদের হাতে পারলে বাঁচিয়ে নাও নিজেদের। আমিই সর্বশক্তিমান এখন। মুখে মাস্ক আর হাতে স্যানিটাইজারের বোতল নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে আমার জন্য। আমিই স্কুল কলেজ, অফিস, কাছারী সব বন্ধ করে দিয়েছি। গত একশ বছরে যা হয়নি তাই করে দেখিয়েছি আমি।

ঘুমের মধ্যে হঠৎ-ই কী যেন একটা দেখে চোখটা খুলে গেল। উঠে দেখি চতুর্দিক জন মানব শূন্য। বাজারে আকাল লেগেছে গ্রামে গঞ্জে মানুষের দিন কাটছে শাক সেদ্য আর পিপড়ের ডিম খেয়ে। আমাদের চির শুভ্র সভ্যতার সারা শরীর নিদারুণ মারি গুটিকায় ভরে উঠেছে। কেউ বলছে এত বছরের জমানো পাপ যেন বেরিয়ে আসছে গর্ভগৃহ থেকে। আর অন্যরা বলছে ধুশ! একদিন এই নিকষ অন্ধকার ভেদ করে আবার দিনমণির উদয় হবে।

এই সব কিছুর মধ্যেই এক কাল্পনিক চায়ের দোকানে বসে চলছে এই অতিমারির চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

হারান দা (চায়ের দোকানের মালিক): কী দিনকাল পড়ল রে ভাই? ঘরে খাবার নেই, দোকানে বিস্কুট নেই, ওদিকে কাল খবরে দেখলাম সরকার নাকি আমাদের জন্য কুড়ি লক্ষ্য কোটি টাকা ত্রাণ দিচ্ছে? তা আমার ভাগে কত এসে পড়বে একটু বল তো সরকার দা?

সরকার দা (প্রাক্তন আমলা): হিসেব বলছে তা প্রায় পনেরো হাজার মতন

শুনেই ওপাশ থেকে বিট্টু বলল: সে গুড়ে সাহারা, হারান দা!

এপাশে আবার অসিত বলল: তোরা না এত নেগেটিভ ভাবিস, সরকার যখন বলেছে তখন তা হবে, আরে বাবা দাদু হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়!

এপাশে বীরেন বাবুর কালো মুখ দেখে হারান জিজ্ঞাসা করল: দাদা, রাজুর কোনও খবর পেলেন? এখনও কেরলেই আছে নাকি?

বীরেন বাবু ক্লান্ত গলায়: হ্যাঁ, কাল ওর মা কে ফোন করেছিল বলল ওখানকার একটা দোকান ঘরে ওরা একসাথে আছে, সরকার থেকে এসে চাল, ডাল দিয়ে যাচ্ছে, তাই দিয়ে কোন রকমে কেটে যাচ্ছে।

কৃষ্ণ মানে কৃষ্ণ সিং ওদের দিকে মিটি মিটি চায় আর চায়ে চুমুক দিয়ে বলে ওঠে, হ্যাম কো ঘার জানা থা, ওখানে আমার বউ বাচ্চা আছে, গত এক মাসে কোনও কাজ নেই ওদের টাকাও পাঠাতে পারিনি, কীভাবে ওরা বেচেঁ আছে জানিনা, হামার মাই তো খুবই অসুস্থ, আমাদের গ্রামে শুনছি অনেকের এই রোগ হয়েছে, যাদের হচ্ছে তাদের তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে

এমন সময় হঠাৎ বিশু দৌড়ে এসে খবর দিল ব্যানার্জী বাড়ির ঠাকুমার নাকি দুদিন ধরে জ্বর ছিল পরশু পজিটিভ ধরা পড়েছে। উনি একাই থাকতেন বাড়িতে ছেলে স্বস্ত্রীক বিদেশে থাকে। দুই আয়া হাসপাতালে নিয়ে গেছিল আজ সকালে নাকি মারা গিয়েছেন। ছেলে বলেছে ফোনে তার যেহেতু আসা সম্ভব নয় তাই হাসপাতাল যা ইচ্ছে করতে পারে তার মায়ের বডি নিয়ে।

সরকার দা হঠাৎ-ই বলে ওঠেন : মানুষ মরে গেলে যাই নাম থাকুক না কেন, সে বডি হয়ে যায়। আর এত প্রাচুর্য থাকতেও বেওয়ারিশ লাশ হয়ে, ধাপার মাঠে স্থান পায়। এই তো জীবন! তাতে আবার এত হিংসা, হানাহানি, বিদ্বেষ।

সবাই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

এমন সময় লাল্টু এসে হাজির, ( এখানে বলে রাখি উনি এলাকা সংলগ্ন হাসপাতালে ওয়ার্ড বয়) : হারান দা সামাজিক দূরত্ব মেনে একটা হালকা করে লিকার চা চিনি কম দিয়ে বানিয়ে দাও তো দেখি।

বিল্টু বলে উঠল : বলছি লাল্টু দা, হাসপাতালে কী অবস্থা গো?

লাল্টু : আর বলিস না ভাই, লাশ রাখার জায়গা নেই, একদিকে প্যাকেট মোড়া পজিটিভ বডি আর অন্য দিকে সাধারণ বডি। সিলিং ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর রাখা যাচ্ছে না, হাসপাতাল থেকে আজ থানায় জানিয়েছে যে প্যাকেট মালগুলোকে ধাপার মাঠে নিয়ে যেতে।

হারান: সরকার দা দেখলেন তো মরে গেলে, মালও হয়ে যায়।

সবাই একটু বিদ্রুপের চোখে তাকালো লাল্টুর দিকে। ভাল হয়ত আমরা কেউই নেই। সারাদিন বাড়িতে থেকে কোনও কাজ না করে বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে সবাই হয়ত নিজেদের কয়েকমাস আগের সোশ্যাল লাইফের সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছি। তবুও এই বাধ্যবাধকতা শুধুমাত্র আপনাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য। এই লড়াই আমাদের আগামীর জন্য। আজকের জনশূন্য ধর্মতলা একদিন আবার হকারের চিল চিৎকারে ভরে উঠবে, পার্কস্ট্রিটের নাইট লাইফ আবার উদ্দাম হয়ে হুক্কাবারে ছাড়বে সাহসী ধোঁয়া। কালিঘাটে আবার ঘণ্টা কাসরে ফুলে বা পূজোর গন্ধে ভরে উঠবে, মসজিদ থেকে আবার আজান ভেসে আসবে, চার্চে আবার লোক আসবে।  শুধু আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা। তত দিন না হয় টিকটক খেলে বা পাবজি করে বা রোদ্দুর রায়ের ভক্তি গীতি শুনে কাটিয়ে দিন। কারণ, কুচ ভি হো যায়ে, মেরে করণ-অর্জুন (আচ্ছে দিন) আয়েঙ্গে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!