বৃহস্পতিবার, মার্চ ৪, ২০২১
Home country আম্ফানে ভেঙেছে বাঁধ, বাংলাদেশের সুন্দরবনের অনেক এলাকায় এখনও ঢুকছে জোয়ার-ভাটার পানি

আম্ফানে ভেঙেছে বাঁধ, বাংলাদেশের সুন্দরবনের অনেক এলাকায় এখনও ঢুকছে জোয়ার-ভাটার পানি

১৭৯ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

২০২০ সাল যেমন কোভিড-১৯ এর জন্য কুখ্যাত হয়ে থাকবে, তেমনি সুন্দরবন সহ ভারত এবং বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের কাছে গত বছরের মে মাসের সুপার সাইক্লোন আম্ফানের কথা ভুলে যাওয়াও সম্ভব নয়।

এখনও পর্যন্ত সুন্দরবনে যে কয়েকটা শক্তিশালী ঝড় বা সুপার সাইক্লোন আছড়ে পড়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল আম্ফান। ২০২০ সালের মে মাসে কয়েক মিনিটের ঝড়ে তছনছ হয়ে গিয়েছে ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অংশ। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সুন্দরবন নিয়ে উভয় দেশেই কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাা রয়েছে কী? সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলবর্তী এলাকার যে মানুষগুলি নিজেদেক ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কা করছেন, তাদের ক্লাইমেট রিফিউজির তকমা দেওয়া হয়েছে কী? উত্তরটা না ছাড়া আর কিছুই নয়।

আম্ফান তো সুন্দরবনে আছড়ে পড়া প্রথম ঝড় নয়। এর আগেও সুন্দরবনে অনেক ঝড় আছড়ে পড়েছে। তবে আম্ফানের তীব্রতা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের অধিকাংশ নদীবাঁধের রক্ষণাবেক্ষণে খামতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সামগ্রিকভাবে সেগুলির মেরামতি হয়নি। তাই আম্ফানের মতো অতি শক্তিশালী ঝড়ের প্রভাবে উপকূলবর্তী এলাকার নদীবাঁধগুলির কোমরটাই যেন কেউ এক লহমায় ভেঙে দিয়েছে। পরিস্থিতি এরকম যে, গত বছরের মে মাসের পর থেকে এখনও পর্যন্ত ভেঙে পড়া এই বাঁধের সমস্ত অংশ মেরামত করা সম্ভব হয়নি। কাজ হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাস, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নদীবাঁধগুলি সম্পূর্ণভাবে মেরামত করা সম্ভব হবে। তবে ঘটনা হল, আম্ফানের পর থেকে সুন্দরবনের বাংলাদেশের  বহু এলাকায়া এখনও বাঁধ ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ার-ভাটার পানি প্রবেশ করে। এলাকাবাসী একপ্রকার নিরুপায়। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দা, বোটানি পাঠরত কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র শাহিন বিল্লা বলেন, ছোটোবেলা থেকেই ঝড়, ঝঞ্জার সাথে যুদ্ধ করছি। তবে আম্ফানের মতো পরিস্থিতি আগে দেখিনি। ষাটের দশকের পর থেকে সুন্দরবনে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। আম্ফানের ফলে সাতক্ষীরার ৩০-৩৫টা জায়গায় নদীবাঁধ ভেঙে যায়। এখনও সেই সব ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সম্পূর্ণভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়নি। হিসাব অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় বাঁধের উচ্চতা ৩০ ফুট হতে হবে। কিন্তু সব জায়গায় তা করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া নদীবাঁধগুলির রক্ষণাবেক্ষণেও অভাব রয়েছে। খুলনার বেদকাশীতে আম্ফানের পর মানুষের অবস্থা খুব খারাপ। মেন রোডের উপর দিয়ে সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে। কারণ আগে যেখানে রাস্তা ছিল, এখন সেখানে নদীর পানি বইছে।

সঙ্কটে কৃষি এবং কর্মসংস্থান

কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেই আছড়ে পড়ে আম্ফান। পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। বাঁধ ভেঙে নোনা জল জমিতে ঢুকে যাওয়ায় এখন ওই সব জমিতে কৃষিকাজ করা যাবে না। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেও জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। তার উপর কোভিড-১৯ এবং লকডাউনের কারণে ঢাকা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে গারমেন্টস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্মরত অনেক মানুষ নিজেদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ শহরে কাজ নেই। এখন করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়্ন্ত্রণে আসায় সুন্দরবনের বহু এলাকার মানুষ আবার কাজের সন্ধানে গ্রাম ছাড়ছেন। কারণ কৃষির উপর তারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে পারছেন না। প্রচুর মাইগ্রেশন হচ্ছে। কর্মসংস্থান নেই। দারিদ্র, নারী নির্যাতন, শিশু শ্রম বেড়েছে।

সুন্দরবন না বাঁচলে আমরা বাঁচব না

কলকাতা হোক বা ঢাকা, সুপার সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে এই বড় শহরগুলিকে রক্ষা করে সুন্দরবন। ঝড়ের প্রথম দাপটা সবচেয়ে শক্তিশালী হল। সেটাই সহ্য করে সুন্দরবন। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দা শাহিন বিল্লা সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, সুন্দরবন আমাদের কাছে একটা আশীর্বাদ। যখনই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে, বুক চিতিয়ে তার মোকাবিলা করে সুন্দরবন। সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো। মা আমাদের রক্ষা করে। তবে আমরা তাকে রক্ষা করি না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় প্রচুর ক্ষতি হয়। অনেক গাছপালা, প্রাণীর ক্ষতি হয়। সুন্দরবনের আয়তন প্রতিনিয়ত কমছে। ছোটবোলায় যা দেখেছি, এখন ভাঙতে ভাঙতে আয়তন কমেছ। গাছপালা কমছে। হরিন হচ্ছে। সম্প্রতি বাগেরহাট থেকে হরিনের চামড়া উদ্ধার করা হয়। সম্ভবত চোরা শিকারীরা এই হরিনগুলিকে মেরে তার চামড়া পাচার করার চেষ্টা করছিল। মধু আহরণের ফলে লোকালয়ে হরিন বেশি আসছে। তখন অনেক মানুষ মেরে সেগুলি মেরে খেয়ে ফেলছে। যদি আমরা এখনই সুন্দরবন রক্ষায় উদ্যোগী না হই, তাহলে উপকূলবাসীর জন্য তো বটেই, গোটা দেশের জন্যই তা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সুন্দরবনে চোরার কাঠের কারবার বেড়ে গিয়েছে। অনেক জায়গায় জঙ্গলের সামনের দিকে গাছ আছে। কিন্তু জঙ্গলের ভিতরে বিশাল বিশাল অংশে গাছ কেটে সাফ করে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গলের ভিতরে সেগুলি মাঠের মতো আকার নিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

ফের অস্বস্তিতে বঙ্গ বিজেপি, কোকেন কাণ্ডে এবার গ্রেফতার রাকেশ সিং

মাদক মামলায় গ্রেফতার করা হল বিজেপি নেতা রাকেশ সিংকে। মঙ্গলবার গভীর রাতে পূর্ব বর্ধমানের গোলসি থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এছাড়া পুলিশের...

কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের থাবায় দুই মৎসজীবী

সুন্দরবনে ফের রয়্যাল বেঙ্গলের আক্রমণ। গত বুধবার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে এক মৎসজীবী গুরুতর আহত হয়েছে। আর একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা...

পুদুচেরির লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পদ থেকে সরানো হল কিরণ বেদিকে

পুদুচেরির লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল কিরণ বেদিকে। মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রপতি ভবনের তরফ থেকে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করা হয়েছে।...

রাধুবাবুর মাটন বা চিকেন কোর্মা ট্রাই করতেই হবে!

গৌরব মুখার্জীআমাদের কলকাতা, যে কলকাতা তিনটে গ্রাম নিয়ে তৈরী হয়েছিল আজ সেই শহর আকারে আয়তনে রোজ একটু একটু করে বড় হচ্ছে তো...

Recent Comments

error: Content is protected !!