বৃহস্পতিবার, জুন ১৭, ২০২১
Home country অতিমারির অন্ধকারে ঈদে চাঁদ যেন আশার আলো

অতিমারির অন্ধকারে ঈদে চাঁদ যেন আশার আলো

২০৬ Views

সীতাংশু ভৌমিক, ফরিদপুর (বাংলাদেশ)

প্রতিবছর ঈদ আসে, পরিযায়ী শ্রমিক-কর্মজীবী মানুষেরা স্বজনদের কাছে ফিরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে নাড়ীর টানে মানুষ গ্রামে ফেরেন। গত দুইটা ঈদ করোনা মহামারির কারণে মানুষ গৃহবন্ধী। এবার বিভিন্ন গারমেন্টসে শ্রমিকদের ছুটি সাতদিন থেকে তিন দিন করা হয়েছে। আবার তা সাতদিন করা হয়েছে শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে। এখনো বহু কল-কারখানা তাদের শ্রমিকদের ঈদ বোনাস তো দূরের কথা, বোকেয়া বেতন দিতে পারেনি। সারাদেশের গণপরিবহন বন্ধ।  হু হু করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। এদিকে করোনার নতুন ভেরিয়েন্টের ছোবলে দিশাহারা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। অন্যদিকে লকডাউন চলছে বাংলাদেশে ঠিকই কিন্তু ঈদে ঘরমুখো মানুষ তা মানছে কই?

হেঁটে, ভ্যান-রিক্সায়, ইজিবাইকে, সিএনজিতে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে নানা উপায়ে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরছেন মানুষ। 

দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষকে ঢাকা থেকে নিজ এলাকায় ফিরতে হলে পদ্ম নদী পেরোতে হয়। আর সেই পদ্মায় আজ সমস্ত নৌযান বন্ধ। তবে জরুরি সেবার জন্য দিনে তিনটি ফেরী চালু রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। এই তিনটি ফেরীতে জরুরি সেবার গাড়ি বা এ্যাম্বুলেন্স থেকে মানুষ পারা পার হয় বেশি। গত দুই দিন আগেও একটি ফেরিকে দুইটি এ্যাম্বুলেন্স ও কয়েক হাজার লোক নিয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছাড়তে দেখেছি।

মানুষ এবছর সত্যিকার অর্থেই হয়তো ঢাকা ছেড়ে ঘরে ফিরছেন, তবে বেশির ভাগ মানুষের এটাই হয়তো ঢাকাকে শেষবারের মতো ছেড়ে আসছেন। গতবছর মার্চ থেকে লকডাউন এবং করোনার কারণে শ্রমজীবী-হকার্সরা ঢাকায় প্রায় বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তেমন রোজগার নেই। তারা কোনো সরকারি সাহায্যও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। তাই একবছরে অনেক নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের দেখা দিয়ে নানা বিধি সংকট। করোনা মহামারির মধ্যে বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে নিঃস্ব হতে হয়েছে। এরকমই একজন মনজু মিয়া। তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পুলিয়া গ্রামে। এক সপ্তাহ আগে আগে তিনি ঢাকায় ছিলেন সপরিবারে। পেশায় ছিলেন একজন শরবত বিক্রেতা। দুই সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে থাকতেন তেজগাঁও এর বেগুনবাড়ি এলাকায়। তবে গত বছর ৮ মার্চ থেকে লকডাউনের কারণে তার রোজগার প্রায় বন্ধ। পরিবারের খরচ জোগাতে তাকে রিক্সা চালাতেও হয়েছে। তবে তাতেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। অবশেষে তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়েছে। তিনি নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসেছেন।

তার কাছে এবার ঈদ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভাই ঈদ তো বছরে দুইটা। গতবছর মেয়েদের কিছু দিতে পারি নাই। এবারও যদি না পারি তাহলে নিজের কাছেই কষ্টলাগে। তাই এবার বাড়িতে আইসা ধান কাটার জোগাল হিসাবে যোগ দিছি। আল্লাহ যদি চান চাঁদ রাতে মেয়েদের নিয়ে মার্কেটে যাবো। হাজার খানিক টাকার মধ্যে ঈদ পালন করব।”

মনজু মিয়ার মতো সারা বাংলাদেশে বেকার কর্মহীন অনেক পিতা এই ঈদে সন্তানদের নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারছেন না। শ্রমজীবী কর্মহীন পরিবারকে সরকারি অনুদান দেওয়া হয়েছে যা এই লকডাউনে, তা অতি সামান্য এবং সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় নি। এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষগুলো লড়ে যাচ্ছেন। জীবন সংগ্রামের লড়াই তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। চারিদিকে যখন এত আঁধার, তার মাঝেই এই খুশির ঈদ যেন অনেকের মনে একটু হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে। অনেকে দোয়া করছেন, পৃথিবী যেন এই মহামারিকে পরাজিত করে আবার সুস্থ হয়ে ওঠে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

আমার স্কুল: পাথরপ্রতিমা আনন্দলাল আদর্শ বিদ্যালয়

ইন্দ্রস্কুল প্রায় সবারই কাছেই প্রিয়। স্কুল এমনই একটি জায়গা যেখানে জীবনের শুরুর দিকে একটা বড় অংশ আমরা কাটাই, অনেক নতুন বন্ধু তৈরি...

ঘোড়ামারা: অভিশাপ না প্রশাসনিক অবহেলা? ক্ষয়িষ্ণু দ্বীপে ভাসমান কিছু প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন প্রত্যয় চৌধুরীজমি নেই, ঘর নেই, বাড়ি নেই। চারিদিকে শুধু জল আর জল! প্রকৃতি যে এরকম নিষ্ঠুর হতে পারে, তা...

নরহরিপুরে ত্রাণ বিলি

দুই সপ্তাহ হতে চলল, এখনও ইয়াস বিধ্বস্ত সমস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতিপূরণ পৌঁছায়নি। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও বিতরণ করা...

ইয়াস: ক্ষতিগ্রস্ত ঘোড়ামারা, পাথরপ্রতিমা বাজারেও ঢুকেছে জল

আম্ফানের পরেই একটি বিধ্বংসী ঝড়ের সাক্ষী হল সুন্দরবন। গত বছরের আম্ফানের মতো এবারও সাইক্লোন ইয়াসে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নদীবাঁধ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।সুন্দরবনের...

Recent Comments

error: Content is protected !!