রবিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২১
Home village নামী ব্র্যান্ডের ভেজাল মধুর বদলে সুন্দরবনের মধুর চাহিদা বেড়েছে

নামী ব্র্যান্ডের ভেজাল মধুর বদলে সুন্দরবনের মধুর চাহিদা বেড়েছে

৪৫০ Views

বিশ্বজিৎ মান্না

আম্ফান, করোনা- এই উভয় জাঁতাকলে পড়ে সুন্দরবনের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সময়টা এমনিতেই খারাপ যাচ্ছে। রোজগার অনেক কমে গিয়েছে। যারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করেন, তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম পাচ্ছিলেন না। অর্গ্যানিক মধু হওয়া সত্ত্বেও সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীদের পকেটে বেশি টাকা ঢুকতো না। তবে সেটা এখন কিছুটা বদলে গিয়েছে। সৌজন্যে দিল্লির একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যার নাম সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের একটি রিপোর্ট। এই সংস্থার একটি রিপোর্ট থেকে সম্প্রতি জানা যায়, ভারতের বাজারে যেসমস্ত নামী ব্র্যান্ডের মধু পাওয়া যাচ্ছে, তার অধিকাংশই ভেজাল। এগুলিতে সুগার সিরাপ মেশানো থাকে।

আরওপড়ুন: ‘বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছেন’

এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই সচেতন ক্রেতাদের একাংশ নামী ব্র্যান্ডের বদলে সুন্দরবনের অর্গ্যানিক মধুর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, বিগত কয়েকমাসে সুন্দরবনের মধু বিক্রি অনেকটাই বেড়েছে। এদিকে দিল্লির ওই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট মানতে রাজী নয় দেশের দুটি অন্যতম নামী মধু ব্র্যান্ড। তাদের দাবি, তাদের মধুতে কোনো ভেজাল নেই। যদিও ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিসের আধিকারিকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পষ্টভাবে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের খাঁটি অর্গ্যানিক মধু বেছে নেওয়াটা অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন: এখনও পর্যটন মানচিত্রের বাইরে পাথরপ্রতিমা

বাজারে সুন্দরবনের মধুর চাহিদা এমনিতেই থাকে। শীতকালে এই চাহিদা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এবার ভেজাল মধুর ব্যাপারটি প্রকাশ্যে আসার পর সুন্দরবনের মধুর কদর আরও বেড়ে গিয়েছে। সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে তৈরি করা তিনটি কোঅপারেটিভ সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীদের নানাভাবে সাহায্য করছে। লাভজনক উপায়ে অর্গ্যানিক মধু সংগ্রহ এবং বিক্রি করার রাস্তা দেখাচ্ছে এই কোঅপারেটিভ। লকডাউন ঘোষণার পর গত চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই সুন্দরবনের অংসগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরতদের রোজগার অনেকটাই কমে গিয়েছে। অনেকে আবার কাজ হারিয়ে দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে ছিলেন। ভিনরাজ্য থেকে অনেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের মধুর চাহিদা হঠাৎ করে কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গরীব মানুষের মুখে হাঁসি ফুটেছে। তারা কিছুটা অবাকও বটে। কারণ সুন্দরবনের মধু অন্যান্যবারের তুলনায় এবার কিছুটা বেশি বিক্রি হচ্ছে। দিন-রাত এক করে সুন্দরবনের মৌলিরা আপাতত মধু সংগ্রহ এবং প্যাকেজিংয়ে ব্যস্ত। পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো এই সুযোগকে তারা পুরোদমে কাজে লাগাতে চাইছেন।
আরও পড়ুন: লন্ডনে লকডাউন

কয়েক প্রজন্ম ধরে মধু সংগ্রহের কাজে যুক্ত রয়েছে সুন্দরবনের বাসিন্দা দেবাশীষ মণ্ডলের (২৮) পরিবার। তিনি বলেন, আম্ফানে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। মধু সংগ্রহকারী বাক্স, মৌমাছি কিছুই ছিল না। সাইক্লোনের কারণে রাস্তাঘাটের এতটাই ক্ষতি হয়েছিল যে মধু এক জায়গা থেকে আর একজায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তারপর শুরু হল লকডাউন। আমরা মধু বিক্রি করতেই পারছিলাম না।
আরও পড়ুন: ৭০ টাকায় চিকেন বিরিয়ানি!

সুন্দরবনের মধু বনফুল হানি হিসেবে বাজারে পাওয়া যায়। এই মার্কেটিংয়ের ধারণা এসেছিল দুই আমলার মাথা থেকে। এর একজন হলেন ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার হিসাবে কর্মরত সন্তোষা গুব্বি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পঞ্চায়েত ও গ্রাম উন্নয়ন দপ্তরের অতিরিক্ত চিফ সেক্রেটারি ড. এম.ভি. রাও। এই উদ্যোগের পিছনে যে আসল উদ্দেশ্য রয়েছে, তা বলেছেন গুব্বি। সংবাদমাধ্যমের সাথে আলাপচারিতার সময় তিনি বলেন, সুন্দরবনে মানুষ এবং বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত এড়িয়ে মধু সংগ্রহের জন্য মৌলিদের একটি বিকল্প রাস্তা প্রদান করাই ছিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এতে নিয়মিত রোজগারের ব্যবস্থাও করা যা। গুব্বির কথায়, সুন্দরবনে অনেকের জমি নেই। সুতরাং তারা রোজগারের জন্য সম্পূর্ণভাবে মাছ ধরা এবং মধু সংগ্রহের উপর নির্ভর করেন।
আরও পড়ুন: The Hungry Tide: যে বই সুন্দরবনকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়

সুন্দরবনের মৌলিদের জীবন বড়ই কষ্টের। অনেক বাধা সরিয়ে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাদের জঙ্গলে যেতে হয়। ইচ্ছে না থাকলেও অনেক সময় বাধ্য হয়ে যেতে হয়। কারণ এটা ছাড়া তাদের রোজগারের বিশেষ বিকল্প নেই। নিজেদের সংসার চালাতে এই কাজ তাদের করতেই হয়। এই পরিস্থিতি বন্যপ্রাণীর সাথে মৌলিদের সংঘাত এড়ানো যায় না। সব জেনেও মৌলিয়া জীবন হাতে নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। গুব্বি বলেন, প্রতি মরসুমে গড়ে পাঁচ জন করে প্রাণ হারান। এই সংখ্যাটা আমরা জানি। অনেক মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে আসে না।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনের দ্বীপগুলির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

তবে বনদপ্তরের উদ্যোগে মৌলিদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে। এখন মধু সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে যাওয়ার বদলে কিছু নির্দিষ্ট ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে তারা মধু সংগ্রহ করতে পারেন, যেখান মানুষের সাথে বন্যপ্রাণীদের সংঘাতের সম্ভাবনা খুব কম। সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার মধ্যে ছিলেন। তবে আধিকারিক রাওয়ের নজের বিষয়টি আসার পর তিনি এর সমাধানের নানা উপায় ভাবতে শুরু করেন। গ্রাউন্ড লেভেলে মৌলিদের সমস্যার সমাধান করতে কোঅপারেটিভ গড়ার পরামর্শ দেন রাও। সংবাদমাধ্যমকে এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ১০ দিনের মধ্যে কোঅপারেটিভ তৈরি করা হয়। নতুন উদ্যোগ হওয়া সত্ত্বেও আমি বেঙ্গল স্টেট কো-অপ ব্যাঙ্ককে ঋণ দেওয়ার আবেদন জানাই।
আরও পড়ুন: বিদেশের বাজারে কোটি টাকায় বিক্রি হওয়া সুন্দরবনের চিংড়ি যারা ধরেন, তাদের কথা কেউ মনে রাখে না

কয়েকদিনের মধ্যেই তৈরি হয় তিনটি কোঅপারেটিভ, কুলতলি সুন্দরবন বনরক্ষক বনমুখী সমবায় সমিতি লি, নলগোরা সুন্দরবন বনরক্ষক বনমুখী সমবায় সমিতি লি এবং ঝড়খালি সুন্দরবন বনরক্ষক বনমুখী সমবায় সমিতি লি। অনেক পরিবারের জন্য নিয়মিত রোজগার নিশ্চিত করে এই কোঅপারেটিভগুলি।

বছর ৩০ বয়সী প্রলয় সামন্ত বাস করেন ভুবনেশ্বরী গ্রামে। তিনি বনফুলের মধু উৎপাদনের বিষয়ের দেখভাল করেন। এছাড়া তিনি সুন্দরবনে একজন সমাজসেবী হিসাবেও কাজ করেন। তিনি এখন মধু সংগ্রহের জন্য জঙ্গলে না গেলেও তার বাবা এবং ঠাকুরদা দুজনেই সারাটা জীবন মৌলি হিসাবে কাজ করেছেন। সুতরাং এই পেশায় কী ঝুঁকি রয়েছে, তিনি সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
আরও পড়ুন: কেরলের লেবার ফ্যাক্টরি হয়ে উঠেছে সুন্দরবন

বনফুলের মধু উৎপাদনের যে উদ্যোগ বর্তমানে নেওয়া হয়েছে, এর জেরে মৌলিদের জীবনে অনেক সুরাহা হয়েছে। প্রলয়বাবু সংবাদমাধ্যমে বলেন, প্রত্যেক বছরই মধু বা কাঁকড়া সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলের খাঁড়িতে অনেকে যান। কেউ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের থেকে পারমিট নিয়ে যান, অনেকে অবৈধভাবে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সহজে হেঁটে যাওয়া যায় না। এরা অনেক সময় কুমীর এবং বাঘের সামনে পড়েন। তবুও তারা যেতে বাধ্য হন।

ভাটার সময় ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এরিয়াল রুট বাইরে বেরিয়ে থাকে। সুন্দরবনের মৌলিদের কাছে এটাও একটা বড় সমস্যা। কারণ এর থেকে তারা চোট পান। সাধারণত ভাটার সময় ছ-সাত জনের দল বেঁধে, ছোটো নৌকাতে করে যান মধু সংগ্রহ করতে। দু-তিন জন নজর রাখেন বাঘ এবং কুমীরের দিকে। প্রলয়বাবু জানান, মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করতে অনেক সময় নৌকা থেকে নেমে, কোমর সমান জলে দাঁড়াতে হয়। এরকম অনেক দিন যায়, যখন সারাদিন ঘুরেও কোনো মধু পাওয়া যায় না বা যেটুকু পাওয়া যায় তা অতি সামান্য।
আরও পড়ুন: আমার গ্রাম- শীত মানেই ক্রিকেট, ঠাকুমার হাতের পাটিসাপটা

মধু সংগ্রহ করাও সহজ কাজ নয়। এর জন্য মৌলিদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। মৌচাক সম্পূর্ণ নষ্ট না করে মধু সংগ্রহ করতে হয়, যাতে পুনরায় সেখান থেকে মধু পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহের সময় মৌ মাছিদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হয়। বনফুল মধুর উদ্যোগে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, আরও কম ঝুঁকি নিয়ে মধু সংগ্রহ করা যায়। এখানে মৌলিদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রদান করা হয়। একই সময়ে, মধুর কোয়ালিটির সাথে কোনো আপোষ করা হয় না। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জনবসতি এলাকা থেকে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে মধু সংগ্রহের বাক্স রাখা হয়। সুতরাং, জঙ্গলের মতো এখানেও একদম খাঁটি মধু পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: শীতকালে সুন্দরবন বেড়াতে যাওয়ার তিনটি আদর্শ জায়গা

প্রসেসড মধুতে একটি নির্দিষ্ট রং থাকেষ যদিও বনফুলের মধুতে তেমনটা থাকে না। কারণ সুন্দরবনে ২৮ থেকে ৩০ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ থাকে। সেখানে বিভিন্ন শেডের মধু পাওয়া যায়। গোল্ডেন থেকে ডার্ক ব্রাউন, দেখা যায় অনেক রংয়ের মধু। গুব্বি বলেন, ম্যানগ্রোভের মধু খুব মিষ্টি। জলজ উপাদানও থাকে। আমরা গাঢ় মধুর সাথে পরিচিত। তাই সুন্দরবনের মধুর সাথে পরিচিত হতে একটু সময় লাগতে পারে।
আরও পড়ুন: শীতকালে পুরুষরা কীভাবে ত্বকের যত্ন নেবেন

সুন্দরবনের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই অনন্য। এটি বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যায় না। গুব্বির মতে, এই প্রকল্পের জেরে মৌলিদের মধু সংগ্রহে ঝুঁকি যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি তাদের রোজগারও আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, লোকাল মার্কেটে এক কেজি মধু থেকে তারা ১২০-৩০০ টাকা পায়। এখন বৃহত্তর বাজারে সেই মধু তারা ৬০০ টাকা কিলোতে বিক্রি করতে পারছেন।

গত বছর এই উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর থেকে অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, বিশ্ববাংলার পাশাপাশি কোঅপারেটিভের নিজস্ব ওয়েবসাইটের (sundarbansjfmc.org) মাধ্যমেও বিক্রি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নেপালে চমক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

স্যামসনের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং, তবুও শেষ হাসি হাসল পাঞ্জাব

স্কোরবোর্ড বলছে, আইপিএল ২০২১-এর চতুর্থ ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসকে ৪ রানে হারিয়ে দিয়েছে পাঞ্জাব কিংস। তবে সেটা দেখে ম্যাচের আসল ছবি বোঝা যাবে...

ধর্নায় বসবেন মমতা

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক প্রচারের উপর 24 ঘন্টার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই...

মানুষ মরে এভাবেই, কেউ খোঁজ রাখে না

বিশ্বজিৎ মান্না ধরুন আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে, বাজারের থলে হাতে নিয়ে বেরোলেন। আপনার বাড়ির লোক বা আপনি কী...

ফের ক্ষমতায় দিদি, তবে বিজেপির আসন বাড়বে: বলছে সমীক্ষা

বিগত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে অন্যতম বিরোধী দল হিসাবে বিজেপি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেন্দ্রের শাসক দলের দাবি, রাজ্যে এবার তারাই ক্ষমতায় আসতে চলেছে।...

Recent Comments

error: Content is protected !!